Home International ফ্রান্সের দাবদাহ কি ভবিষ্যতের ‘নতুন স্বাভাবিক’?

ফ্রান্সের দাবদাহ কি ভবিষ্যতের ‘নতুন স্বাভাবিক’?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
19 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • মে মাসের শেষ থেকে ফ্রান্সে পরপর তিন দফা তাপপ্রবাহ, ৪০ ডিগ্রি পেরিয়েছে তাপমাত্রা।
  • দাবদাহের সঙ্গে ভয়াবহ খরা, নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং নজিরবিহীন বনাগ্নি।
  • বিজ্ঞানীদের মতে, এই চরম আবহাওয়া জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের বাইরে নয়—তবে ধারাবাহিকতা নতুন প্রশ্ন তুলছে।
  • পশ্চিম ইউরোপে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের সংখ্যা অনেক মডেলের পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে।
  • একটি গ্রীষ্মের অভিজ্ঞতা দিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সতর্ক থাকার পরামর্শ বিজ্ঞানীদের।
  • আসল উদ্বেগ শুধু তাপমাত্রা নয়; এমন এক পৃথিবীর জন্য মানুষ কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নও ক্রমশ বড় হচ্ছে।

মে মাসের ২১ তারিখ থেকে ফ্রান্স যেন একের পর এক জলবায়ু ধাক্কার মুখোমুখি। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি পৌঁছনোর আগেই দেশটি তিন দফা তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে। আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি দিনের সাক্ষী হয়েছে দেশটি। বহু অঞ্চলে জারি হয়েছে সর্বোচ্চ স্তরের লাল সতর্কতা। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

দাবদাহের সঙ্গে এসেছে ভয়াবহ খরা, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বনাগ্নি এবং শুকিয়ে যাওয়া নদী-খাল। বছরের এই সময়ে এর আগে কখনও এত বড় এলাকা জুড়ে বন পুড়ে যায়নি। ফলে চলতি গ্রীষ্মকে বর্ণনা করতে আবহাওয়াবিদদের মুখে বারবার ফিরে আসছে একই শব্দ—‘অভূতপূর্ব’, ‘ঐতিহাসিক’, ‘ব্যতিক্রমী’।

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি জলবায়ুবিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে? বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কি প্রত্যাশার তুলনায় আরও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে?

বিজ্ঞানীদের বড় অংশের উত্তর—এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় হয়নি।

চরম আবহাওয়া কি সত্যিই অপ্রত্যাশিত?

আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (আইপিসিসি) প্রথম কার্যকরী গোষ্ঠীর প্রাক্তন সহসভাপতি এবং বিশিষ্ট জলবায়ুবিজ্ঞানী ভ্যালেরি মাসোঁ-দেলমোর মতে, এই পরিস্থিতিতে তাঁর পরিচিত কোনও বিজ্ঞানীই বিস্মিত নন।

কারণ বহু দশক ধরেই গবেষকেরা সতর্ক করে আসছেন—গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ পৃথিবীকে যত উষ্ণ করবে, ততই ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দেবে তাপপ্রবাহ, খরা, বনাগ্নি ও প্রবল ঝড়।

তাঁর মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীকে ইতিমধ্যেই এক ‘বিপজ্জনক অঞ্চলে’ নিয়ে গেছে। ফলে এই ধরনের চরম আবহাওয়া আর বিরল ব্যতিক্রম নয়; ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠছে নতুন বাস্তবতা।

জুনের তাপপ্রবাহ: বিরল, কিন্তু পূর্বাভাসের বাইরে নয়

চলতি বছরের জুনের দাবদাহ নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ঘটনাটি জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের বাইরে নয়।

ফরাসি গবেষক জুলিয়েন ক্যাতিওর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে এ ধরনের তাপপ্রবাহের পুনরাবৃত্তি প্রায় ৫০ বছরে একবার হতে পারে। অর্থাৎ এটি অত্যন্ত বিরল, কিন্তু অসম্ভব নয়।

তুলনায় ২০০৩ সালের ভয়াবহ ইউরোপীয় তাপপ্রবাহ ছিল আরও বেশি ব্যতিক্রমী। সেই সময় বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন, এমন ঘটনা ৩০০ থেকে ৫০০ বছরে একবার ঘটতে পারে।

তবে বর্তমান তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ হতে পারত বলেও মনে করছেন গবেষকেরা। আর এই ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়ে ওঠা ফ্রান্সে মানুষের জীবন কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

একের পর এক তাপপ্রবাহই এখন বড় ধাঁধা

বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে কোনও একটি তাপপ্রবাহ নয়, বরং মে, জুন ও জুলাইয়ে পরপর তিনটি তাপপ্রবাহের ঘটনা।

এ ধরনের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত বিরল। যদিও একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০২২ সালেও গ্রীষ্মে তিনটি বড় তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। সেই বছর মে মাস এবং অক্টোবরের শেষেও অস্বাভাবিক গরমের রেকর্ড হয়েছিল।

ফরাসি গবেষক ক্রিস্তফ কাসুর মতে, এই ধারাবাহিকতা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। এর পেছনে নিছক পরিসংখ্যানগত কাকতালীয়তা কাজ করছে, নাকি বায়ুমণ্ডলের কোনও বিশেষ বিন্যাস দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিম ইউরোপে তাপপ্রবাহের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে—তা খতিয়ে দেখতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

উত্তর আটলান্টিক থেকে এল নিনো—কোথায় লুকিয়ে কারণ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা একাধিক সম্ভাবনা পরীক্ষা করছেন।

একটি সম্ভাবনা হল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ ঠান্ডা জলের অঞ্চল। গবেষকদের ধারণা, এটি পশ্চিম ইউরোপের ওপর দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপ বলয় বা অ্যান্টিসাইক্লোন তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে গরমের পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে শক্তিশালী এল নিনো। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা ইউরোপে খুব বড় প্রভাব ফেলে না। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াগত সংযোগ বা ‘টেলিকানেকশন’-এর ধরন বদলে যেতে পারে।

তবে এই তত্ত্ব এখনও নিশ্চিত নয়। আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

একটি বিষয় অবশ্য ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। পরপর তাপপ্রবাহ হলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। শুকনো মাটি আরও দ্রুত উত্তপ্ত হয়। ফলে পরবর্তী তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সমুদ্রের জলও যদি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

ভবিষ্যতের ঝলক, নাকি পুরো ভবিষ্যৎ?

তাহলে কি ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মই শতাব্দীর শেষের পৃথিবীর আগাম ছবি?

বিজ্ঞানীদের উত্তর—আংশিকভাবে হ্যাঁ, আবার পুরোপুরি নয়।

আজকের ফ্রান্সে যে ধরনের গ্রীষ্ম দেখা যাচ্ছে, শতাব্দীর শেষ নাগাদ সেটিই হয়তো গড় গ্রীষ্মে পরিণত হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে এর চেয়েও অনেক বেশি তীব্র তাপপ্রবাহ এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মানেই প্রতি বছর আগের বছরের চেয়ে বেশি গরম হবে—এমন নয়। প্রাকৃতিক ওঠানামা সবসময় থাকবে। ফলে মাঝেমধ্যে তুলনামূলক শীতল গ্রীষ্মও আসতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কি সত্যিই দ্রুততর হচ্ছে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই।

জুরিখের সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক রবিন নয়েলের মতে, একটি গ্রীষ্মের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি বেড়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে টানা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতা বুঝতে কয়েক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৯৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হয়েছিল। সেই সময় জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারীরা নানা যুক্তি তুলেছিলেন। পরে অবশ্য দেখা যায়, সেটি ছিল জলবায়ুর স্বাভাবিক ওঠানামারই অংশ।

তবে উদ্বেগের জায়গা অন্যত্র।

প্রায় সব জলবায়ু মডেলই পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মের চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি বাস্তবের তুলনায় কিছুটা কম দেখিয়েছে। অথচ বাস্তবে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়ছে।

নয়েলের ভাষায়, যেন পাশা ছুড়ে বারবার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি পাঁচ ও ছয় উঠছে। ঘটনাগুলি অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সম্ভাব্য ‘দুষ্টচক্র’

কিছু গবেষক আরও উদ্বেগজনক সম্ভাবনার কথাও বলছেন।

বায়ুদূষণ কমে যাওয়ায় আগে যে উষ্ণতা আংশিকভাবে আড়ালে ছিল, এখন তা আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

আরও বড় আশঙ্কা হল, পৃথিবীর জলবায়ু হয়তো এমন কিছু ‘দুষ্টচক্রে’ ঢুকে পড়ছে, যেখানে একটি পরিবর্তন নিজেই পরবর্তী পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

ফরাসি গবেষক দাভিদে ফারান্দার মতে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপে যেভাবে পরপর রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে, তার পুরো চিত্র বর্তমান জলবায়ু মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।

জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় এ ধরনের ধারাবাহিক রেকর্ড ভাঙা ঘটনা কখনও কখনও বড় পরিবর্তনের আগাম সংকেতও হতে পারে।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা: প্রস্তুতির অভাব

তবে অনেক বিজ্ঞানীর মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি নিয়ে বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—সমাজ ও সরকার কতটা প্রস্তুত।

ক্রিস্তফ কাসুর মতে, মানুষ প্রায়ই জানতে চায় জলবায়ু মডেল ঠিক ছিল কি না বা উষ্ণায়ন প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত হচ্ছে কি না। কিন্তু এই প্রশ্ন অনেক সময় আসল সমস্যাকে আড়াল করে দেয়।

ভ্যালেরি মাসোঁ-দেলমোতও একই মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ধারাবাহিক তাপপ্রবাহের চেয়েও বেশি বিস্ময়কর হল মানুষের প্রস্তুতির অভাব।

বহু বছর ধরে সরকার ও প্রশাসন আগাম পরিকল্পনার বদলে প্রতিবার জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ বারবার হাতছাড়া হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে পৃথিবী কত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। প্রশ্ন হল—আমরা কি এমন এক পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত, যেখানে চরম আবহাওয়া আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles