হাইলাইটস
- গাজার ভেতরে বিশাল মাটির বাঁধ, রাস্তা ও সামরিক অবকাঠামো তৈরি করছে ইজরায়েল।
- স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে নতুন নির্মাণের তথ্য সামনে এনেছে এপি।
- বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অবকাঠামো গাজার বিভিন্ন অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
- ইজরায়েলের দাবি, হামাসের যাতায়াত ঠেকানো ও সেনাদের নিরাপত্তাই মূল লক্ষ্য।
- সমালোচকদের প্রশ্ন—এটি সাময়িক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নাকি গাজার ভবিষ্যৎ মানচিত্র বদলের প্রস্তুতি?
গাজার ভেতরেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক ভূ-বাস্তবতা। বিশাল মাটির বাঁধ, প্রশস্ত সামরিক রাস্তা, পর্যবেক্ষণ পোস্ট এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করছে ইজরায়েল। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই নির্মাণকাজ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক প্রতিরক্ষার অংশ নয়—গাজার ভূখণ্ডকে একাধিক বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে ভাগ করার বৃহত্তর কৌশলেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।
স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এপি জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণাংশে দ্রুত গতিতে উঁচু মাটির বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই বাঁধ কয়েক মিটার উঁচু। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সেনা চলাচলের জন্য প্রশস্ত সড়ক এবং নজরদারির ব্যবস্থা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলে গাজার একাধিক এলাকা একে অপরের থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মানুষের চলাচল, ত্রাণ সরবরাহ এবং বেসামরিক জীবনের ওপর।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনী এই প্রকল্পের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে জানায়নি। তবে তাদের বক্তব্য, হামাসের যোদ্ধাদের চলাচল সীমিত করা, অস্ত্র পরিবহণ ঠেকানো এবং ইজরায়েলি সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। সামরিক সূত্রের দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নির্দিষ্ট এলাকায় এমন অবকাঠামো প্রয়োজন।
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এই মাটির বাঁধ ও সামরিক করিডরগুলি গাজার বাস্তব সীমারেখাই বদলে দিতে পারে। স্থায়ীভাবে এসব অবকাঠামো থেকে গেলে গাজার ভূখণ্ড কার্যত কয়েকটি আলাদা খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে।
এর আগেও গাজার মধ্যে একাধিক সামরিক করিডর তৈরি করেছে ইজরায়েল। উত্তর ও দক্ষিণ গাজার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে নেটজারিম করিডর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মিশর সীমান্ত বরাবর ফিলাডেলফি করিডরও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন মাটির বাঁধ সেই একই নীতিকে আরও বিস্তৃত রূপ দিতে পারে।
এপি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণকাজে ভারী বুলডোজার, মাটি কাটার যন্ত্র এবং বহু ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মাটি ফেলে উঁচু বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে নজরদারি বাড়ানো সম্ভব, অন্যদিকে যানবাহন ও মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গাজার বাসিন্দাদের কাছে এই নতুন নির্মাণ আরও অনিশ্চয়তার বার্তা নিয়ে এসেছে। বহু পরিবার ইতিমধ্যেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এখন যদি অঞ্চলগুলি স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, চিকিৎসা পরিষেবা এবং খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পাওয়াও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মানবিক সংস্থাগুলিও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, ত্রাণবাহী ট্রাকের চলাচল আরও সীমিত হলে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট তীব্র হতে পারে। গাজার বহু হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র এখনও পর্যাপ্ত সরবরাহের অভাবে সমস্যায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাজার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই বাস্তবে নতুন ভৌগোলিক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইজরায়েল অবশ্য বারবার জানিয়েছে, গাজা দখল করা তাদের লক্ষ্য নয়। তাদের দাবি, হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং সীমান্তবর্তী ইজরায়েলি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই মাটির বাঁধ কি সাময়িক যুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নাকি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্মাণ শুধু মাটি, রাস্তা ও সামরিক অবকাঠামোর বিষয় নয়। এটি গাজার ভবিষ্যৎ মানচিত্র নিয়েও নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুদ্ধ চলাকালীন তৈরি হওয়া এই নতুন ভূ-বাস্তবতাগুলির রাজনৈতিক প্রভাবও তত গভীর হতে পারে।