Home SportsFIFA 2026 বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে স্নায়ুযুদ্ধ: স্কালোনি–দে লা ফুয়েন্তের কথায় ফুটে উঠল দুই দর্শনের লড়াই

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে হাসি-ঠাট্টার আড়ালে স্নায়ুযুদ্ধ: স্কালোনি–দে লা ফুয়েন্তের কথায় ফুটে উঠল দুই দর্শনের লড়াই

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
45 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • একই জুতো পরে ম্যাচে নামার কুসংস্কারের গল্প শোনালেন লিওনেল স্কালোনি।
  • লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সংযত মন্তব্য।
  • একে অপরের দলকে প্রবল সম্মান জানালেন দুই কোচ।
  • বল দখল, কৌশল ও মানসিকতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করলেন স্কালোনি।
  • বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে সাংবাদিক বৈঠকে হাস্যরস, দর্শন ও আত্মবিশ্বাসের মিশেল।

টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে এক ঢোক জল খেলেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তারপর পাশে বসা দলের মিডিয়া ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হবে। খুব পরিষ্কার ইংরেজিতে বলবেন, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।”ঘরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখে তখন হাসি। কারণ প্রশ্নটা ছিল স্কালোনির বহুদিনের একটি অভ্যাস নিয়ে—প্রতিটি ম্যাচে কি তিনি একই জুতো পরেন? অনেকের ধারণা, এটি তাঁর সৌভাগ্যের প্রতীক।স্কালোনি হেসেই সেই ধারণা ভেঙে দেন।“আমার কোনও কুসংস্কার নেই,” বলেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা শোনান তিনি।

২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় এক জোড়া জুতো টানা পরতেন। দলও একের পর এক ম্যাচ জিতছিল। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর সেই জুতোর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দেন।“আমি বলেছিলাম, বিদায় জুতো। তারপর আর কোনও নির্দিষ্ট জুতো পরিনি,” বলেন আর্জেন্টিনা কোচ।এক সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করেন, মাঠে কি তিনি এখনও ডান পা আগে রেখে প্রবেশ করেন?প্রথমে অস্বীকার করতে গিয়েও থেমে যান স্কালোনি।“না… না… হ্যাঁ, করি। তবে এটা তো আমি খেলোয়াড় থাকাকালীনও করতাম,” বলে হেসে ফেলেন তিনি।এরপর যোগ করেন, “আমার কোচিং স্টাফের অন্যদের হয়তো নানা কুসংস্কার আছে। কিন্তু আমার খুব বেশি নেই।”


বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র দু’দিন আগে আর্জেন্টিনা ও স্পেন—দুই দলের সাংবাদিক সম্মেলন ছিল যেন চাপের ম্যাচের আগে এক বিরল স্বস্তির মুহূর্ত। মাঠের উত্তেজনার বদলে সেখানে ছিল রসিকতা, হাসি আর গভীর ফুটবল আলোচনা।দুই কোচই যেন সচেতনভাবে চাপ কমিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।অন্যদিকে দুই অধিনায়ক—স্পেনের রদ্রি এবং আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ—ছিলেন অনেক বেশি সংযত। সংক্ষিপ্ত উত্তরেই শেষ করেন অধিকাংশ প্রশ্ন।বরং সাংবাদিকরাই বেশি উৎকণ্ঠিত ছিলেন। কে কোন প্রশ্ন করবেন, তা নিয়ে শুরু থেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছিল।


স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বরাবরই সাংবাদিকদের প্রিয়। তাঁর রসবোধের জন্য তিনি আলাদা পরিচিত।এক সাংবাদিক জানতে চান, “প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে কি কোনও দুশ্চিন্তা হচ্ছে?”কিছুক্ষণ ভেবে দে লা ফুয়েন্তে উত্তর দেন, “আমরা হেলিকপ্টারে এখানে এসেছি। আবার হেলিকপ্টারেই ফিরতে হবে। সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নার্ভাস করছে।”মুহূর্তেই হাসিতে ফেটে পড়ে পুরো সংবাদ সম্মেলন কক্ষ। অনেক ভিডিওগ্রাফার পর্যন্ত হাসতে গিয়ে ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।


অবশ্য সবচেয়ে প্রত্যাশিত প্রশ্ন ছিল লিওনেল মেসি এবং লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে।ইয়ামালকে অনেকেই মেসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন।দে লা ফুয়েন্তে অবশ্য তুলনাটা খুব সতর্কভাবে সামলালেন।“মেসি অনন্য। তিনি অসাধারণ প্রতিভা, একই সঙ্গে তরুণদের জন্য আদর্শ।”তারপরই যোগ করলেন, “কিন্তু লামিনেকে লামিনেই থাকতে হবে। তাকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করার দরকার নেই।”


স্কালোনির কাছেও আসে আরেকটি স্বাভাবিক প্রশ্ন—দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন?আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, “আমরা বন্ধু। কিন্তু তাই বলে ফুটবল নিয়ে একে অপরের সব চিন্তাভাবনা জানি, এমন নয়।”তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আমরা জানি একে অপরের দল কীভাবে খেলে। কিন্তু বসে কখনও নিজেদের কৌশল নিয়ে আলোচনা করিনি।”এরপর দুই দলের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করেন স্কালোনি।তাঁর মতে, দুই দলই বল দখলে রাখতে ভালোবাসে, কিন্তু দর্শন আলাদা।আর্জেন্টিনা অনেক সময় শুধুমাত্র প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত ও বিরক্ত করার জন্য নিজেদের মধ্যে বল ঘোরায়।অন্যদিকে স্পেন দ্রুত আক্রমণে ওঠে। একের পর এক ছোট পাস খেলেও তারা অনেক বেশি উল্লম্বভাবে এগোয়।


যদিও স্কালোনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেননি।এই আর্জেন্টিনা বল ছাড়াও সমান কার্যকর।দীর্ঘ সময় বল ছাড়াই থেকে হঠাৎ বিধ্বংসী আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা তাদের অন্যতম শক্তি।স্কালোনির আরেকটি বৈশিষ্ট্য বড় ম্যাচে অপ্রত্যাশিত কৌশল নেওয়া। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আঙেল দি মারিয়াকে প্রথম একাদশে রাখার সিদ্ধান্তই তার বড় উদাহরণ।অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে অনেক বেশি পরিকল্পনাবদ্ধ। তিনি হঠাৎ সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী নন। প্রতিটি পরিবর্তন দীর্ঘ চিন্তার ফল।


একজন আরেকজনের দলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাও প্রকাশ করেন।স্কালোনি বলেন, “স্পেন যদি শুধু হোটেল থেকেও বেরিয়ে পড়ে, তখন থেকেই আমার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যায়।”দে লা ফুয়েন্তে মনে করিয়ে দেন, গত চার বছরে আর্জেন্টিনা যে সব বড় ফাইনালে উঠেছে, সবকটিই জিতেছে।তাঁর বক্তব্য, “ওরা কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, আবার কোপা—সব জিতেছে। কিন্তু আমি শুধু সেই বিষয়গুলো নিয়েই ভাবি, যেগুলো আমার নিয়ন্ত্রণে আছে। অর্থাৎ আমাদের দলের পারফরম্যান্স।”


সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন স্কালোনি।আগে তিনি মাঠে খুব কম আবেগ প্রকাশ করতেন। এখন প্রায় প্রতিটি বড় ম্যাচের পর তাঁকে চোখের জল ফেলতে দেখা যায়।কেন?“কারণ আমি দেখি আমার দেশের মানুষ কত আনন্দ করছে। তাদের মুখের হাসি দেখলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। হৃদয় স্পর্শ করে যায়,” বলেন তিনি।


দে লা ফুয়েন্তে অবশ্য সূক্ষ্মভাবে আর্জেন্টিনার শারীরিক ফুটবলের প্রসঙ্গও তোলেন।তিনি বলেন, “রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ যেন কাউকে নিয়মের সীমা অতিক্রম করতে না দেন। ফুটবলের আইন ভাঙার সুযোগ যেন না থাকে।”এরপর তিনি রোমান সম্রাট ও দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াসের একটি ভাবনা উদ্ধৃত করেন।“যা মৌচাকের উপকারে আসে না, তা মৌমাছিরও উপকারে আসে না।”তাঁর ব্যাখ্যা, একজন ফুটবলারেরও সব সময় দলের স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।শেষে উপস্থিত তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল আরও সহজ।“জয়ের কোনও গোপন মন্ত্র নেই। কাজ, কাজ আর কাজ। কখনও থেমে যেও না। পরিশ্রমের ফল একদিন না একদিন মিলবেই।”তবে রবিবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষে সেই পরিশ্রমের পুরস্কার পাবে একটিমাত্র দল। স্কালোনি ও দে লা ফুয়েন্তে—দু’জনেই প্রার্থনা করছেন, সেই দলটি যেন তাদেরই হয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles