হাইলাইটস:

  • ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই নাগরিকত্ব বাতিল হয় না, জানাল সুপ্রিম কোর্ট।
  • বিহারের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) সংক্রান্ত রায়ের ব্যাখ্যা দিল শীর্ষ আদালত।
  • নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন করা, নাগরিকত্ব নির্ধারণ নয়।
  • সন্দেহজনক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।
  • নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকা থেকে কোনও ব্যক্তির নাম বাদ পড়লেই তিনি ভারতের নাগরিকত্ব হারান না। শুক্রবার এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে এই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধন করা হলেও, নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের নেই। কোনও ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে, তার নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক বা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।

এই পর্যবেক্ষণ আসে বিহারে পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে। আদালত স্পষ্ট জানায়, ওই রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার কোনও সুযোগ নেই।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমাদের রায় একেবারে পরিষ্কার। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানেই কোনও ব্যক্তি নাগরিকত্ব হারিয়েছেন, এমন নয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো, যাতে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।”

সুপ্রিম কোর্টের এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সম্প্রতি বিহারের বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে বহু মানুষ কার্যত নাগরিকত্বের অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বারবার দাবি করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র প্রকৃত ভোটারদের তালিকা প্রস্তুত করা।

শীর্ষ আদালতের এ দিনের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়ে গেল, ভোটাধিকার এবং নাগরিকত্ব—দুটি আলাদা আইনি বিষয়। কোনও ব্যক্তি ভোটার তালিকায় না থাকলেও তিনি ভারতের নাগরিক হতে পারেন। আবার নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠলে তার নিষ্পত্তি হবে নাগরিকত্ব আইন এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নয়।

আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং সেই উদ্দেশ্যে সঠিক ভোটার তালিকা তৈরি করা। কিন্তু নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্ন বিচার করার ক্ষমতা কমিশনের আওতায় পড়ে না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত মামলাগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ এতে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হল যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া এবং নাগরিকত্ব হারানো—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।

বিহারের SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে বহাল রাখা হলেও, একই সঙ্গে আদালত এ দিন জোর দিয়ে জানিয়ে দিল, কমিশনের সিদ্ধান্তেরও একটি সাংবিধানিক সীমারেখা রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের পর যদি কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তবে সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ। নির্বাচন কমিশন কেবল প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠাতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের এই ব্যাখ্যা এমন সময়ে এল, যখন বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। আদালতের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ভোটার তালিকা প্রশাসনিক নথি হলেও নাগরিকত্ব একটি পৃথক আইনি মর্যাদা, যা কেবল আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে পারে।