হাইলাইটস:
- পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় ৩৬টি দেশের অধিকাংশেই আমেরিকার তুলনায় চিন সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব বেড়েছে।
- দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমেরিকার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- অনেক দেশে শি জিনপিং সম্পর্কে আস্থা এখনও সীমিত হলেও ট্রাম্পের তুলনায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
- তবে ভারত এই প্রবণতার ব্যতিক্রম—এখানে এখনও আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব চিনের তুলনায় অনেক বেশি।
- বাণিজ্য, প্রযুক্তি, কূটনীতি এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় এই জনমতের পরিবর্তন ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা ও চিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু সামরিক শক্তি, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জনমতও ক্রমশ এই প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক সমীক্ষা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের বহু দেশে এখন আমেরিকার তুলনায় চিনকে বেশি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। গত বছর পর্যন্ত যেখানে আমেরিকার ভাবমূর্তি চিনের চেয়ে এগিয়ে ছিল, সেখানে এবার প্রথমবারের মতো পরিস্থিতি উল্টে গিয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টার বিশ্বের ৩৬টি দেশে এই সমীক্ষা চালায়। তাতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলির অধিকাংশেই চিন সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত আমেরিকার তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি, শুল্ক বৃদ্ধি, মিত্র দেশগুলির সঙ্গে টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির প্রতি অনীহা আমেরিকার ভাবমূর্তিকে ধাক্কা দিয়েছে। অন্যদিকে চিন নিজেকে উন্নয়ন সহযোগী, বিনিয়োগকারী এবং অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
সমীক্ষায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে রাষ্ট্রনেতাদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্পর্কে এখনও বহু দেশের মানুষের আস্থা খুব বেশি নয়। তবে গত বছরের তুলনায় তাঁর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আস্থা একাধিক দেশে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্নেও শি অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন।
তবে এই বৈশ্বিক প্রবণতার একটি বড় ব্যতিক্রম ভারত। সমীক্ষা বলছে, ভারতের মানুষ এখনও আমেরিকাকে চিনের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে দেখেন। এর পিছনে রয়েছে একাধিক বাস্তব কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত-আমেরিকা কৌশলগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশ গবেষণা, শিক্ষা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক এখনও সীমান্ত বিরোধের কারণে উত্তেজনাপূর্ণ। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। পূর্ব লাদাখে সেনা মোতায়েন, সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব ভারতের সাধারণ মানুষের মনেও চিন সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। ফলে বিশ্বে চিনের ভাবমূর্তি উন্নত হলেও ভারতে সেই পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিন গত এক দশকে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের বহু দেশে অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে নিজেদের নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এই কৌশল অনেক দেশের জনমতেও প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি বহু পুরনো মিত্র দেশের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অতিরিক্ত শুল্ক, ন্যাটো-সহ বিভিন্ন জোট নিয়ে কঠোর অবস্থান এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির বদলে একতরফা সিদ্ধান্তের প্রবণতা আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক ধারণাকে দুর্বল করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তবে পিউর সমীক্ষা একই সঙ্গে দেখিয়েছে, ইতিবাচক ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেলেও চিনকে নিয়ে সংশয় পুরোপুরি কাটেনি। মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, তাইওয়ান প্রশ্ন এবং দক্ষিণ চিন সাগরে বেইজিংয়ের আগ্রাসী অবস্থান নিয়ে এখনও বহু দেশের মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চিনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও রাজনৈতিক ও মূল্যবোধের প্রশ্নে সন্দেহ এখনও রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমীক্ষার ফল কেবল জনমতের পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। বিশ্ব এখন ক্রমশ বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। অনেক দেশ আর কেবল ওয়াশিংটনের উপর নির্ভর করতে চাইছে না; একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক কূটনীতি হবে আরও জটিল এবং প্রতিযোগিতামূলক।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর হচ্ছে, অন্যদিকে চিন প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে নয়াদিল্লিকে দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এই সমীক্ষা তাই শুধু জনপ্রিয়তার হিসাব নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির লড়াই এখন মানুষের মন জয়ের লড়াইও। আর সেই প্রতিযোগিতায় আপাতত বিশ্বমঞ্চে আমেরিকাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে চিন—যদিও ভারতের জনমত এখনও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে একমত নয়।