Table of Contents
হাইলাইটস
- হোমারের মহাকাব্যকে নতুন, আরও গভীর ব্যাখ্যায় হাজির করেছেন ক্রিস্টোফার নোলান।
- যুদ্ধ নয়, মানুষের ভয়, অপরাধবোধ ও মানবিকতার অন্ধকারই ছবির আসল কেন্দ্রবিন্দু।
- ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথাওয়ে, টম হল্যান্ড ও রবার্ট প্যাটিনসনের দুর্দান্ত অভিনয় ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি।
- হোয়টে ভ্যান হোয়টেমার চিত্রগ্রহণ ও লুডভিগ গোরানসনের আবহসংগীত ছবিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
- অনেক সমালোচকের মতে, এটিই হতে পারে নোলানের সেরা চলচ্চিত্র।
হোমারের ‘ওডিসি’ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বলা, লেখা ও পুনর্নির্মিত মহাকাব্যগুলির একটি। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাহিনি নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি আর নতুন শিল্পমাধ্যমে ফিরে এসেছে। তাই এমন এক কিংবদন্তিকে আবার পর্দায় আনা নিঃসন্দেহে বড় ঝুঁকির কাজ। কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলান শুধু সেই ঝুঁকি নেননি, তিনি গল্পটিকে এমনভাবে নতুন করে কল্পনা করেছেন যে অনেকের মতে, এটি মূল কাহিনিরও এক সাহসী পুনর্জন্ম।
ছবি মুক্তির পর আবারও পুরনো বিতর্ক জোরালো হবে—‘মেমেন্টো’, ‘দ্য ডার্ক নাইট’, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ওপেনহাইমার’ নাকি ‘দ্য ওডিসি’? কারণ এই ছবিতে নোলান তাঁর পরিচিত বিশাল ক্যানভাস, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, আধুনিক সংবেদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে এক অসাধারণ ভারসাম্যে মিলিয়েছেন।
যুদ্ধের পরের যুদ্ধ
গল্প শুরু হয় ট্রয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার আট বছর পরে। যুদ্ধ জিতে প্রায় সব গ্রিক রাজাই দেশে ফিরেছেন। শুধু ইথাকার রাজা ওডিসিউসের (ম্যাট ডেমন) কোনও খোঁজ নেই। তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না, সেটিও কেউ জানে না।
ইথাকায় তাঁর স্ত্রী পেনেলোপি (অ্যান হ্যাথাওয়ে) একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে রাজ্য ও পরিবারের সম্মান রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ছেলে টেলেম্যাকাস (টম হল্যান্ড) বিশ্বাস করে, তাঁর বাবা এখনও জীবিত। সেই বিশ্বাসই তাকে বাবার সন্ধানে যাত্রা করতে বাধ্য করে।
এদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অ্যান্টোনিয়াস (রবার্ট প্যাটিনসন) পেনেলোপিকে বিয়ে করে ইথাকার সিংহাসন দখলের ছক কষছে।
আর দূরে কোথাও, অভিশাপ, ঝড়, সমুদ্র আর নিজের অতীতের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন ওডিসিউস। কিন্তু তাঁর এই যাত্রা শুধু সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার নয়; এটি এক মানুষের নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার গল্প।
মহাকাব্য নয়, এক গথিক দুঃস্বপ্ন
সবচেয়ে বড় চমক এখানেই। ‘দ্য ওডিসি’ কোনও প্রচলিত যুদ্ধের মহাকাব্য নয়, পৌরাণিক ফ্যান্টাসিও নয়। নোলান এই কাহিনিকে রূপ দিয়েছেন এক গথিক মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে।
অন্ধকার আলো, অস্বস্তিকর নীরবতা, রহস্যময় ফ্রেমিং আর চাপা আতঙ্ক—সব মিলিয়ে পুরো ছবিজুড়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত ভয়ের আবহ। সেই ভয় দানব বা দেবতার নয়; মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতার।
যুদ্ধের নৃশংসতা, ক্ষমতার লোভ, সহিংসতার উত্তরাধিকার এবং মানবিক অবক্ষয়কে নোলান এমনভাবে দেখিয়েছেন যে অনেক দৃশ্যই দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলবে। তবু কোথাও তিনি অকারণ রক্তপাত বা চমকের আশ্রয় নেননি। বরং ভয়ের মধ্যেও ছবির সৌন্দর্য ও মহিমা অটুট থেকেছে।
চোখ ও কানের জন্য এক বিস্ময়
চিত্রগ্রাহক হোয়টে ভ্যান হোয়টেমা আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি আজকের সেরা সিনেমাটোগ্রাফারদের একজন। উত্তাল সমুদ্র, যুদ্ধবিধ্বস্ত উপকূল কিংবা নিঃসঙ্গ ওডিসিউস—প্রতিটি ফ্রেম যেন জীবন্ত ক্যানভাস। বিশেষ করে আইম্যাক্সের জন্য নির্মিত দৃশ্যগুলো ছবিকে এক অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
লুডভিগ গোরানসনের আবহসংগীতও সমান শক্তিশালী। কোথাও গভীর নীরবতা, কোথাও বিস্ফোরক অর্কেস্ট্রা—এই ওঠানামাই ছবির আতঙ্ক ও আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। অনেক মুহূর্তে সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলে সংগীত।
অভিনয়ের ঝলক
ম্যাট ডেমন সম্ভবত ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত, ক্লান্ত অথচ অদম্য এক রাজাকে তিনি অসাধারণ সংযমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর চোখের ক্লান্তিই অনেক সময় সংলাপের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
টম হল্যান্ডও দারুণ চমকে দেন। টেলেম্যাকাসকে তিনি শুধু কিংবদন্তির উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বাবাকে খুঁজতে মরিয়া এক তরুণ হিসেবে জীবন্ত করে তুলেছেন।
অ্যান হ্যাথাওয়ে পেনেলোপির চরিত্রে শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও অসহায়ত্ব—তিনটিকেই নিখুঁত ভারসাম্যে ধরে রেখেছেন।
জেনডায়া ও চার্লিজ থেরনের উপস্থিতি সীমিত হলেও স্মরণীয়। ক্যালিপসো হিসেবে সামান্থা মর্টন একই সঙ্গে রহস্যময়, ভীতিকর এবং করুণ।
তবে পুরো ছবির সবচেয়ে বড় চমক নিঃসন্দেহে রবার্ট প্যাটিনসন। অ্যান্টোনিয়াস চরিত্রে তিনি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বাস্তবসম্মত ও ঘৃণ্য খলনায়ক সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দুষ্টতা কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়; বরং ঠান্ডা মাথার নিষ্ঠুরতা, ধূর্ততা আর ক্ষমতার লোভের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। প্রতিটি দৃশ্যে তিনি অস্বস্তি তৈরি করেন, আর সেখানেই তাঁর সাফল্য।
লুপিটা নিয়ঙ্গো ও এলিয়ট পেজও নিজেদের সীমিত উপস্থিতিতে গল্পে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক স্তর যোগ করেছেন।
শেষ অঙ্কেই নোলানের আসল জাদু
ছবির শেষ তিরিশ মিনিট যেন নোলানের নির্মাণশৈলীর প্রদর্শনী। প্রথমে তিনি ওডিসিউসকে দেখান ভাঙা, ক্লান্ত, অপরাধবোধে জর্জরিত এক মানুষ হিসেবে। তারপর ধীরে ধীরে, কোনও নাটকীয় বাড়াবাড়ি ছাড়াই, সেই মানুষটিকেই আবার কিংবদন্তির নায়কে পরিণত করেন।
এই রূপান্তর এতটাই স্বাভাবিক যে কোথাও কৃত্রিম মনে হয় না।
সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধ, ক্ষমতা, সহিংসতা, সম্মতি এবং মানবিকতার মতো সমসাময়িক বিষয়গুলোকে নোলান গল্পের ভেতরে এমনভাবে বুনেছেন যে তা কখনও বক্তৃতা হয়ে ওঠে না। বরং ছবিটি শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে, মানুষের পক্ষে।
রায়
‘দ্য ওডিসি’ শুধু হোমারের মহাকাব্যের আরেকটি চলচ্চিত্ররূপ নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত অন্ধকার, যুদ্ধের মূল্য এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুন ভাষায় বলা এক অসাধারণ সিনেমা।
অভিনয়, চিত্রগ্রহণ, আবহসংগীত এবং নোলানের গল্প বলার দক্ষতা মিলিয়ে এটি এমন এক চলচ্চিত্র, যা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর হিসেবেও আলোচনায় উঠে আসতে পারে।