হাইলাইটস
- বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী স্পেন অধিনায়ক রদ্রি।
- তাঁর মতে, এই বিশ্বকাপের সেরা চার দলই শেষ চারে উঠেছে।
- ফ্রান্সের আক্রমণ যেমন শক্তিশালী, তেমনই তাদের রক্ষণও অসাধারণ—সতর্ক থাকতে হবে।
- লামিনে ইয়ামালকে শান্ত থেকে সঠিক মুহূর্তে নিজের প্রতিভা ব্যবহার করার পরামর্শ রদ্রির।
- অধিনায়ক হিসেবে মাঠের বাইরে দলকে একসঙ্গে রাখাকেই নিজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
- বিশ্বকাপ জয়কে জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন বলে মনে করেন ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মিডফিল্ডার।
স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি হার্নান্দেজের কাছে ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা এবং নেতৃত্বের সমন্বয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের ষষ্ঠ ম্যাচের আগে, ডালাসের কটন বাউলে বসে তিনি জানালেন, টুর্নামেন্টের অধিকাংশ ম্যাচই তিনি দেখেছেন। কিছু দর্শক হিসেবে, কিছু প্রতিপক্ষকে বোঝার জন্য। তবে মজা করে বলেন, “এমন নয় যে আমি কলম-কাগজ নিয়ে বসে থাকি। যদিও সত্যি বলতে কী, হয়তো আমিই সবচেয়ে বেশি বিশ্লেষণ করি।”এই স্বভাবই রদ্রিকে আলাদা করে। ব্যালন ডি’অরজয়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা প্রশাসনের ছাত্র, মাঠে কার্যত কোচের ভূমিকাও পালন করেন। ড্রেসিংরুমে তাঁর কথা সবাই মন দিয়ে শোনে।রদ্রির মতে, বিশ্বকাপের ১০০টি ম্যাচ শেষে একটি বিষয় পরিষ্কার—শেষ চারে উঠেছে সত্যিই টুর্নামেন্টের সেরা চারটি দল। ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচকে তিনি “দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই” বলে উল্লেখ করলেও তাঁর সমস্ত মনোযোগ স্পেন-ফ্রান্স সেমিফাইনালেই।
“ফ্রান্স এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দল। তারা দারুণ ছন্দে আছে। কিন্তু স্পেনও তাই। আমরা তাদের হারাতে পারি। ইউরো ও নেশনস লিগে সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।”সাম্প্রতিক ইতিহাসও স্পেনের পক্ষে। গত বছর নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেন ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারায়। যদিও শেষ স্কোর যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখায়, বাস্তবে স্পেন একসময় ৫-১ গোলে এগিয়ে ছিল। তারও আগে ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে স্পেন জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। এমনকি ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপেও রদ্রির স্পেন সেমিফাইনালে ফ্রান্সকেই হারিয়েছিল।
তবে তিনি অতীতের ফলাফলে ভরসা করতে রাজি নন।“ফ্রান্সের আক্রমণ খুব শক্তিশালী। কিন্তু আমি তাদের রক্ষণকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেব। তারা নিচু ব্লকে দুর্দান্তভাবে রক্ষণ করে, শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং খুবই আক্রমণাত্মক। আমাদের ম্যাচটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যেতে হবে।”রদ্রির মতে, গত বছরের ৫-৪ ধরনের ম্যাচ এবার হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
“বিশ্বকাপ আলাদা। আমি মনে করি না এবার এত খোলা ম্যাচ হবে। আমাদের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।”গত দুই বছরে রদ্রির নিজের পথটাও সহজ ছিল না। ইউরো ২০২৪ ফাইনালে হ্যামস্ট্রিং চোট, তারপর হাঁটুর ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে দীর্ঘ পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি ব্যালন ডি’অর গ্রহণ করতেও তাঁকে ক্রাচ নিয়ে মঞ্চে উঠতে হয়েছিল।এখন তিনি মনে করছেন, ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দে ফিরেছেন।
“আমি ভালো অনুভব করছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দলও ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে। টুর্নামেন্টের শুরুতে আমি বলেছিলাম, এটা দীর্ঘ পথ। নিজেদের সেরা সংস্করণে পৌঁছতে সময় লাগবে। এখন মনে হচ্ছে আমরা সেই জায়গায় পৌঁছচ্ছি।”এই দলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লামিনে ইয়ামাল। ইউরো ২০২৪-এ মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত গোল করে তিনি বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। নেশনস লিগেও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলেন। এবারও সবার নজর তাঁর দিকে।রদ্রি অবশ্য ইয়ামালকে নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সতর্কতার কথাও বললেন।
“আমি যখন ১৯ বছরের ছিলাম, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকতাম। মাঝে মাঝে ছোটখাটো পার্টিও করতাম—যদিও সেটা বলা উচিত নয়,” বলে হেসে ওঠেন তিনি।তারপরই গম্ভীর হয়ে বলেন—“আমার জীবন আর লামিনের জীবন একেবারেই আলাদা। আমি তখনও পেশাদার ফুটবলারই হইনি। আর সে ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা।”তাঁর মতে, ইয়ামালের অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে এখনও শেখার অনেক কিছু বাকি।
“ম্যাচের কোন মুহূর্তে কী করতে হবে, সেটা আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে। ওর মধ্যে এত ফুটবল আছে যে সব সময়ই সবকিছু দেখাতে চায়। আমাদের কাজ ওকে শান্ত রাখা, সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে শেখানো।”রদ্রি জানালেন, ইয়ামাল সব পরামর্শ মন দিয়ে শোনে।“ও খুব আত্মসমালোচনামূলক। সব সময় উন্নতি করতে চায়। আমি ওকে বলি, ফাউল না পেলেও খেলা থামাবে না। এগিয়ে যেতে হবে। ও শেখার জন্য সব সময় প্রস্তুত।”
অধিনায়ক হিসেবে রদ্রির ভূমিকা শুধু মাঠে নয়, ড্রেসিংরুমেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউরো জয়ের সময় নেতৃত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন দানি কারভাহাল, আলভারো মোরাতা এবং তিনি নিজে। এখন কারভাহাল ও মোরাতা আর দলে নেই। ফলে পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।“অধিনায়কের কাজ শুধু মাঠে নেতৃত্ব দেওয়া নয়। যারা খেলছে না, তাদেরও দলে জড়িয়ে রাখা সমান জরুরি। সবাই কখনও না কখনও এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে। তাই আমি চেষ্টা করি, যেমন ব্যবহার আমি নিজের জন্য চাইতাম, ঠিক তেমন ব্যবহার তাদের সঙ্গেও করতে।”
তিনি উদাহরণ দেন ফাবিয়ান রুইজ, পেদ্রি এবং মিকেল মেরিনোর। কেউ শুরু থেকে খেলেননি, কিন্তু সুযোগ পেয়ে প্রত্যেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।শেষ পর্যন্ত রদ্রির চোখ শুধু একটাই লক্ষ্য দেখছে—বিশ্বকাপ।“বিশ্বকাপ জেতা একজন ফুটবলারের সর্বোচ্চ স্বপ্ন। এর চেয়ে বড় কিছু নেই। ইতিহাসে খুব কম অধিনায়ক এই ট্রফি তুলতে পেরেছেন। আমরাও সেই ইতিহাসের অংশ হতে চাই।”