হাইলাইটস:
- মিশরের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর আবেগে ভেসেছেন লিওনেল মেসি ও কোচ লিওনেল স্কালোনি
- শেষ ষোলোতে বিদায়ের মুখ থেকে ফিরে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা
- সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে রক্ষণ, কৌশল ও স্কালোনির সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
- সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে শুধু মেসির জাদু নয়, আরও পরিণত ফুটবল খেলতে হবে আর্জেন্টিনাকে
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের এই আসরের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি হয়তো আটলান্টার সেই মুহূর্ত, যখন মাঠে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন লিওনেল মেসি। তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। কয়েক মিনিট আগেও আর্জেন্টিনা ছিল শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের একেবারে দোরগোড়ায়। মিশরের কাছে দুই গোলে পিছিয়ে থাকা দলটির আশা তখন কার্যত নিভে যাওয়ার মুখে। তারও আগে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। ম্যাচ হেরে গেলে সমস্ত দোষ যে তাঁর কাঁধেই বর্তাত, তা প্রায় নিশ্চিত ছিল।
কিন্তু ঠিক সেই সময়ই আবার দেখা গেল চেনা মেসিকে। বহুবারের মতো অসম্ভবকে সম্ভব করলেন তিনি। মাত্র দশ মিনিটের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ম্যাচের চেহারা পুরো বদলে দিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তিন গোলের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোর সেই রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
শেষ বাঁশি বাজার পর শুধু মেসিই কাঁদেননি। কেঁদেছেন তাঁর সতীর্থরাও। আবেগ সামলাতে পারেননি প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনিও। মাঠের ধারে টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তাঁর চোখেও জল। সাংবাদিকের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “আমি আপনার দিকে তাকাতেই পারছি না। দুঃখিত। আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। কী অসাধারণ একটা দল! আর কিছু বলতে পারছি না, আমাকে যেতে হবে।”
স্কালোনির নিজের খেলোয়াড়েরাই নাকি তাঁকে মজা করে ডাকেন “কাঁদুনে” বলে। কিন্তু সেই রাতে তাঁর চোখের জল ছিল শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; ছিল মৃত্যুদ্বার থেকে ফিরে আসা একটি দলের স্বস্তির অশ্রু।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মতো এত বৈচিত্র্যময় আবেগ আর কোনও দল সমর্থকদের উপহার দেয়নি। শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে অনায়াসে প্রতিপক্ষদের হারিয়ে এগিয়েছে তারা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেন নিজের সেরা বিশ্বকাপ খেলছেন। উদ্বোধনী ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে টুর্নামেন্টের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন তিনি। এরপরও ধারাবাহিকভাবে গোল বাড়িয়েছেন।
প্রতিটি ম্যাচেই মেসির পায়ে দেখা গেছে জাদুর ঝলক। কিন্তু দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে ধীরে ধীরে ফাটল ধরা শুরু করেছে। মিশরের বিরুদ্ধে যে বিপদে পড়েছিল আর্জেন্টিনা, তার আগেও কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় গোল না এলে হয়তো বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনই ঘটে যেত। সেই ম্যাচেও আর্জেন্টিনা কার্যত বিদায়ের মুখে পৌঁছে গিয়েছিল।
এই দুটি ম্যাচ আর্জেন্টিনার শক্তি যেমন দেখিয়েছে, তেমনি দুর্বলতাও সামনে এনে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে দলের স্থিতিশীলতা নিয়ে। প্রতিবারই কি শেষ মুহূর্তের অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের উপর ভর করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনায় তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটিয়ে তিনি দেশকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। পাশাপাশি জিতেছেন টানা দুটি কোপা আমেরিকাও। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সংবাদমাধ্যম তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন তোলেনি।
কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিকবার বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন স্কালোনি। এমনকি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতেও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, কেপ ভার্দে কিংবা মিশরের বিরুদ্ধে নাটকীয় লড়াইয়ের পরও তিনি দাবি করেছেন, পুরো ম্যাচেই নাকি আর্জেন্টিনা নিয়ন্ত্রণে ছিল। অথচ মাঠের ছবি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেপ ভার্দে অন্তত সমানে সমান লড়েছে। মিশরও দীর্ঘ সময় ধরে খেলায় আধিপত্য দেখিয়েছে।
অবশ্য এমন পরিস্থিতি আর্জেন্টিনার জন্য নতুন নয়। ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও তারা একাধিকবার এগিয়ে গিয়ে সেই লিড হারিয়েছিল। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনালেও দু’বার এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গিয়ে জিততে হয়েছিল।
এই নাটকীয়তা দর্শকদের কাছে নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালের মতো উচ্চস্তরের ম্যাচে এটি বিপজ্জনকও হতে পারে। বিশেষ করে সামনে যখন সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ সুইৎজারল্যান্ড।
একবার যদি তারা এগিয়ে যায়, কিংবা আর্জেন্টিনা লিড হারায়, তাহলে আগের মতো ফিরে আসা অনেক কঠিন হতে পারে।
মাঠের বাইরেও সমস্যার শেষ নেই। মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিশরের প্রধান কোচ প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছেন, ম্যাচটি পক্ষপাতদুষ্টভাবে পরিচালিত হয়েছে।
একই সময়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার (এএফএ) যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক চুক্তি পরিচালনা নিয়ে তদন্তের খবরও সামনে এসেছে। অভিযোগ, কিছু আর্থিক লেনদেন ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। যদিও এএফএ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উত্তর আমেরিকায় সংস্থার প্রতিনিধি তোমাস রেগালাদো জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হওয়া মানেই দোষী প্রমাণিত হওয়া নয়।
তবে মাঠের ভেতরে এসব বিতর্কের খুব একটা প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি।
স্বাগতিক দেশগুলোর বাইরে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সমর্থক এসেছে আর্জেন্টিনা থেকে। প্রতিটি শহরেই নীল-সাদা জার্সির ঢেউ দেখা গেছে। স্টেডিয়ামের বাইরে হাজার হাজার সমর্থকের মিছিল, গান, ঢাক, নাচ আর পতাকার সমুদ্র যেন আলাদা এক উৎসব তৈরি করেছে।
দল এগিয়ে থাকুক কিংবা বিপদের মুখে পড়ুক—সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে কোনও ভাটা পড়েনি। শেষ মুহূর্তের প্রত্যাবর্তনের সময়ও গ্যালারির সেই অদম্য সমর্থনই যেন বাড়তি শক্তি জুগিয়েছে দলকে।
স্কালোনিও বারবার স্বীকার করেছেন, সমর্থকদের ভূমিকা এই বিশ্বকাপে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিশরের বিরুদ্ধে জয়ের পর তিনি বলেন, “আমরা পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই সমর্থকদের অযথা কষ্ট দিয়েছি।”
কোচের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, তিনি এখনও অতিরিক্ত নির্ভর করছেন বয়স্ক খেলোয়াড়দের উপর। দলে পর্যাপ্ত রোটেশন করছেন না। ফলে নকআউট পর্বে ক্লান্তির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মেসি নিজেই।
কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন কপালে বড়সড় কালশিটে নিয়ে। ম্যাচজুড়ে তাঁকে লাগাতার ফাউল করা হয়েছিল। পরে হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, “যারা আমাকে মাঠে লাথি মারে, ম্যাচ শেষে তারাই আবার জার্সি চায়।”
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ক্লান্তির ছাপও স্পষ্ট ছিল।
সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ক্লান্তি নিয়ে নামা সহজ হবে না। শুধু মেসির প্রতিভার উপর নির্ভর করলে চলবে না। দলের অন্যদেরও আরও দীর্ঘ সময় ধরে একই তীব্রতায় খেলতে হবে। রক্ষণে শৃঙ্খলা বাড়াতে হবে। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে। সুযোগ নষ্ট করলে চলবে না।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কখনও কখনও শুধুই আবেগ আর বিশ্বাসের জোরে ম্যাচ জিতেছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু নকআউটের প্রতিটি ধাপ যত এগোবে, প্রতিপক্ষও তত কঠিন হবে।
তবু এই বিশৃঙ্খল, নাটকীয়, শেষ মুহূর্তে বেঁচে ওঠা আর্জেন্টিনাকেই ভালোবেসে ফেলেছেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। কারণ এই দল কখনও হাল ছাড়ে না। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত তারা বিশ্বাস করে, কিছু একটা ঘটবেই।
স্কালোনিও হয়তো সেই বিশ্বাসেই আস্থা রাখেন।
মিশরের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য জয়ের পর তিনি বলেছিলেন, “ফুটবল শুধু কৌশল বা পরিকল্পনার খেলা নয়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের হৃদয় যদি না থাকত, তাহলে আমরা অনেক আগেই বিদায় নিতাম।”
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই হৃদয় আবারও পরীক্ষার মুখে পড়বে। তবে এবার শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন আরও সংগঠিত, আরও পরিণত এবং আরও নির্ভুল ফুটবল। কারণ প্রতিবার অলৌকিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয় না। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে অলৌকিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক উৎকর্ষও।