হাইলাইটস:
- বিশ্বকাপে মাঠের নায়ক থেকে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।
- গোল, নেতৃত্ব, রসবোধ ও রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখ।
- প্যারিসের উপকণ্ঠ বঁদিতে বেড়ে ওঠা এমবাপ্পের জীবনগাথা আজ ফরাসি সমাজেরও প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু গোল, ট্রফি কিংবা কৌশলের লড়াই নয়। এটি চরিত্রেরও মঞ্চ। এ বারের বিশ্বকাপ যেন সেই অর্থেই আলাদা। ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল ড্রেসিংরুমে রাবারের ফিতের মতো লাফিয়ে বেড়িয়েছেন, রেফারি ইভান বার্টন এমন কঠোর ভঙ্গিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যেন মাঠেই মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো তাঁর দামী পোশাক দিয়ে মধ্যবয়সী পুরুষদের নতুন ফ্যাশনের অনুপ্রেরণা হয়েছেন। মেক্সিকোর কোচ জাভিয়ের আগুয়েরে আবার রসিকতার ছলে ইংল্যান্ডের অ্যান্টনি গর্ডনকে উদ্দেশ করে অশালীন মন্তব্য করে দুই দেশের সম্পর্ককেও হাস্যরসের নতুন মাত্রা দিয়েছেন।
আরলিং হালান্ড দেখিয়েছেন, গোলমুখে তিনি হাঙরের মতো নির্মম হতে পারেন, আবার গোল করার পর শিশুর মতো হাসতেও পারেন। ফুটবল যে আনন্দের খেলাও বটে, সেটাই যেন মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এমনকি সব সময় মাপা কথার মানুষ হ্যারি কেন-ও এই বিশ্বকাপে নিজের গম্ভীর আবরণ ভেঙে কিছুটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু এই সমস্ত চরিত্রেরও উপরে একজন আছেন। মাঠে গোল করার পর দু’হাত গুটিয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে।
ছোটবেলায় তাঁকে নিয়ে মানুষ হাসত। মাত্র তিন বছর বয়সে ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত গেয়ে ঘোষণা করতেন—একদিন তিনি ফ্রান্সের জার্সি পরবেন। সবাই সেটাকে শিশুসুলভ কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। আজ তিনি ফরাসি ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
পরিবারের বন্ধুরা একসময় তাঁকে ঠাট্টা করে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়াম-এর একটি মডেল উপহার দিয়েছিলেন। কারণ তিনি বলতেন, একদিন রিয়াল মাদ্রিদ সিএফ-এর হয়ে খেলবেন। আজ সেই ক্লাবেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার তিনি।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে জয়সূচক পেনাল্টি করার পর ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিট তিনি মাঠে হাঁটছিলেন এক প্রশস্ত, নির্ভার হাসি নিয়ে। যেন জানেন, শেষ পর্যন্ত জয় তাঁরই হবে। ফুটবলের দুনিয়ায় এমবাপ্পে যেখানে যান, শেষ পর্যন্ত সেখানেই জয় তাঁর।
তাঁর গতি, শক্তি, ড্রিবলিং কিংবা বিস্ফোরক আক্রমণাত্মক ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ফরাসি ভাষায় অসাধারণ ফুটবলারকে বলা হয় “ক্র্যাক”। এমবাপ্পের চেয়ে এই অভিধার যোগ্য আর কেউ নেই। তিনি এত দ্রুত যে নিজের নামের একটি অংশকেও পিছনে ফেলে এসেছেন। এক সময় ছিলেন এমবাপ্পে লোতাঁ। এখন পৃথিবী তাঁকে শুধু এমবাপ্পে নামেই চেনে।
এবারের বিশ্বকাপে রেফারির শরীরে লাগানো ক্যামেরা দর্শকদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। কাছ থেকে দেখা গেছে, এমবাপ্পের ফুটবল শুধু গতির নয়, সূক্ষ্মতারও। তাঁর ট্যাকল শক্তিশালী, আবার বল কেড়ে নেওয়া যেন পকেটমারের নিঃশব্দ দক্ষতা। তাঁর আক্রমণ নির্মম, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই শেষ। শিকার ধরার পর আর অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা নেই।
এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি এক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তাঁকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য কৌতুক, ছবি, ব্যঙ্গচিত্র তৈরি হয়েছে। কেউ তাঁকে স্বৈরশাসকের সঙ্গে তুলনা করেছে, কেউ আবার সম্রাটের আসনে বসিয়েছে। ফরাসি কোচ দিদিয়ে দেশঁ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁর অধিনায়ক কোনো স্বৈরশাসক নন, সতীর্থদের অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই ব্যঙ্গচিত্রগুলো এমবাপ্পের জনপ্রিয়তাই আরও বাড়িয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতিতে যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি মিম তৈরি হয়, তিনিই আসলে সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক চরিত্র। এমবাপ্পে সেই মর্যাদাই অর্জন করেছেন।
তাঁর আগে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কিংবা জিনেদিন জিদান কখনও এই ধরনের ইন্টারনেট সংস্কৃতির কেন্দ্রে ছিলেন না। এমবাপ্পে এক নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা ফুটবল ও ডিজিটাল সংস্কৃতিকে একই সুতোয় গেঁথে ফেলেছে।
ফরাসি ফুটবল শুধু পায়ের খেলা শেখায় না, কথাও শেখায়। সেখানে তরুণ ফুটবলারদের জন্য বক্তৃতা ও বাগ্মিতার প্রতিযোগিতাও হয়। এমবাপ্পে ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ বক্তা।
এই বিশ্বকাপে তাঁর সংবাদ সম্মেলনগুলোও আলাদা আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ফুটবলের কৌশল, সতীর্থদের ভূমিকা, পানীয় বিরতি—সব বিষয়ে তিনি স্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত ও চিন্তাশীল মন্তব্য করেছেন। কোচ দেশঁকে তিনি একসঙ্গে “বন্ধু”, “রসিক” এবং “শৃঙ্খলাপরায়ণ বাবা” বলে বর্ণনা করেছেন।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত নিজের উপর হাসতে পারা।
কৈশোরে সহপাঠীরা একদিন তাঁর পোশাক নিয়ে ঠাট্টা করেছিল। পরদিন তিনি ইচ্ছে করেই আরও অদ্ভুত পোশাক পরে স্কুলে গিয়েছিলেন। তারপর শিক্ষিকাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ম্যাডাম, আমি কি সুন্দর লাগছি?” অর্থাৎ, ঠাট্টাকে তিনি নিজের অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।
২০২৪ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে এক সাংবাদিক নিজেকে “চরম বামপন্থী” বলে পরিচয় দিলে এমবাপ্পে সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, “ভাগ্যিস আপনি অন্য পাশে বসেননি।”
নিজেকে নিয়ে হাসতে জানেন বলেই তিনি অন্যের সমালোচনাকেও সহজে গ্রহণ করতে পারেন।
আর এখানেই তিনি আগের প্রজন্মের অনেক তারকার থেকে আলাদা। মাইকেল জর্ডান একসময় বলেছিলেন, “রিপাবলিকানরাও জুতো কেনেন।” অর্থাৎ রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চলাই ভালো। এমবাপ্পে ঠিক উল্টো পথ বেছে নিয়েছেন।
প্যারাগুয়ের এক সিনেটর তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্য করার পর এমবাপ্পে প্রকাশ্যে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ঘৃণা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কখনও নীরব থাকবেন না।
বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া তারকারা বিতর্ক এড়িয়ে চলেছেন। এমবাপ্পে সেই নীরবতার সংস্কৃতি ভেঙে দিয়েছেন।
তাঁর এই ব্যক্তিত্বের পেছনে রয়েছে পারিবারিক শিক্ষা। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত চঞ্চল। তাই তাঁর বাবা-মা তাঁকে শুধু ফুটবল শেখাননি। সপ্তম শ্রেণি থেকেই একজন মনোবিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল। বাঁশি বাজানো, নাটক শেখা—সব কিছুর মধ্য দিয়েই তাঁর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে।
প্যারিসের উপকণ্ঠ বঁদির ছোট্ট একটি মহল্লায় তাঁর বেড়ে ওঠা। বাড়ি থেকে কয়েক কদম দূরেই ছিল স্থানীয় ফুটবল মাঠ। এই বিশ্বকাপে পৃথিবীর যে কোনো শহরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ফুটবলার এসেছে প্যারিস অঞ্চল থেকেই।
বঁদি শুধু এমবাপ্পের জন্মস্থান নয়। উইলিয়াম সালিবা-সহ আরও বহু আন্তর্জাতিক ফুটবলারেরও শৈশব কেটেছে এখানে।
জনবহুল আবাসন, সরকারি ক্রীড়া পরিকাঠামো, সামাজিক সংহতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল যেন আধুনিক ফরাসি ফুটবলের উর্বর ভূমি।
এই কারণেই এমবাপ্পে শুধু একজন তারকা নন। তিনি আধুনিক ফ্রান্সের প্রতীকও।
তিনি একদিকে রাষ্ট্রনায়কের মতো কথা বলেন, অন্যদিকে কৌতুক অভিনেতার মতো মানুষকে হাসান। তিনি সামাজিক মাধ্যমে অগণিত রসিকতার কেন্দ্র, আবার বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠগুলোরও একটি। তিনি যেমন অসাধারণ ফুটবলার, তেমনি সংস্কৃতিবান, চিন্তাশীল এবং আত্মসচেতন একজন মানুষ।
ফুটবলের ইতিহাসে তিনি দ্রুত এগিয়ে চলেছেন সম্রাটের মতো নিশ্চিন্ত পদক্ষেপে। ইতিহাসে অনেক সম্রাটকে নিজের মাথায় নিজেকেই মুকুট পরাতে হয়েছে। কিন্তু ফুটবলের সিংহাসনে আজ কার মাথায় সেই মুকুট, তা নিয়ে আর কোনো বিতর্ক নেই।
আজকের ফুটবল-সম্রাটের নাম—কিলিয়ান এমবাপ্পে।