হাইলাইটস:
- সুইডেনকে দাপটের সঙ্গে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ আটে ফ্রান্স।
- কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসির সমতায়।
- মাইকেল অলিজে দুটি গোলের পাস দিয়ে ম্যাচের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
- কোচ দিদিয়ের দেশঁ বললেন, সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ, তাই উন্নতির জায়গা এখনও রয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের স্মৃতি তৈরি হয় এমনই কিছু ম্যাচ দিয়ে। স্কোরলাইন যতটা বলে, ফ্রান্সের আধিপত্য তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। তবে এই জয়ের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল তাদের আক্রমণভাগের ফুটবলে—যে ফুটবল মুহূর্তে পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না, পরে ফিরে তাকালে যার মাধুর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে আরও দুটি নিখুঁত গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসির সমতায় পৌঁছে গিয়েছেন। অন্যদিকে মাইকেল অলিজে গোল না পেলেও দুটি অসাধারণ পাস দিয়ে পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর নৈপুণ্যে বারবার স্তব্ধ হয়ে যায় নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সির দর্শকাসন। এই মুহূর্তে দিদিয়ের দেশঁর দলকে শিরোপার প্রধান দাবিদার বলে মনে হচ্ছে, আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয়—তাদের সেরাটা যেন এখনও দেখা বাকি।
ম্যাচের পর দেশঁ বলেন,
“ফ্রান্স দলে অসাধারণ মানের ফুটবলার রয়েছে। তারা যখন এই মানসিকতা ও একাগ্রতা নিয়ে খেলতে পারে, তখন ভবিষ্যতের জন্য সেটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।”
তবে বরাবরের মতোই সতর্ক থেকেছেন ফরাসি কোচ। তিনি বলেন,
“এখন থেকে প্রতিপক্ষ আরও শক্তিশালী হবে। তাই আমাদের খেলায় এখনও কিছু সূক্ষ্ম দিক আরও নিখুঁত করতে হবে।”
ইস্ট রাদারফোর্ডের গরম বিকেলে প্রথম আধঘণ্টা ম্যাচটি ছিল বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বলের দখল ছিল ফ্রান্সের কাছে, কিন্তু পাল্টা আক্রমণে সুইডেনও বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। এরপরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।
৩০ মিনিটে আদ্রিয়াঁ রাবিয়োর জোরালো শট পা বাড়িয়ে কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন সুইডেনের গোলরক্ষক ইয়াকব ভিডেল জেটারস্ট্রম। এরপর এমবাপ্পে একবার বারের ওপর দিয়ে মারেন, আবার একেবারে কাছ থেকে পোস্টে বল লাগান। ৩৫ মিনিটে অলিজের দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিক পোস্টে লাগে। ফিরতি বলে ওসমান দেম্বেলের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিছুক্ষণ পর দূরপাল্লার অলিজের আরেকটি শটও দারুণ দক্ষতায় বাঁচান সুইডিশ গোলরক্ষক।
শেষ পর্যন্ত কর্নার থেকেই আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। দেম্বেলে ছোট পাস দেন অলিজেকে। বল ফেরত পেয়ে এমবাপ্পের উদ্দেশে বাড়িয়ে দেন। ডান দিক থেকে বক্সের ভেতরে বল পেয়ে সামনে থাকা ডিফেন্ডারকে ছলনা করে চোখের পলকে বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। সুইডিশ রক্ষণ বুঝে ওঠার আগেই ফরাসি ফুটবলাররা দেশঁকে ঘিরে উদ্যাপনে মেতে ওঠেন।
এই উদ্যাপন ছিল শুধু গোলের আনন্দ নয়, দলের ঐক্যেরও প্রতীক। গত সপ্তাহে নিজের মাকে হারিয়েছেন দেশঁ। সেই কঠিন সময়ে গোটা দল কোচের পাশে দাঁড়িয়েছে। এমবাপ্পে পরে বলেন,
“একসঙ্গে থাকা এবং একে অপরকে সমর্থন করা আমাদের দলের স্বভাবের মধ্যেই রয়েছে।”
দ্বিতীয়ার্ধের আট মিনিটের মাথায় ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফ্রান্স। সুইডেন ফরাসি আক্রমণ থামালেও বল হারায়। অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি সঙ্গে সঙ্গে বল তুলে দেন অলিজেকে। তিনি রক্ষণভাগ চিরে নিখুঁত পাস বাড়ান ব্র্যাডলি বারকোলার উদ্দেশে। বক্সে ঢুকে বারকোলা জোরালো শটে বল জালের ছাদে জড়িয়ে দেন।
দ্বিতীয়ার্ধে অলিজে যেন নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন। কখনও ডান প্রান্তে, কখনও মাঝমাঠে নেমে, কখনও আবার রক্ষণভাগের পেছনে দৌড়ে তিনি বারবার বল চাইছিলেন এবং প্রতিবারই আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করছিলেন। এক ঘণ্টার মাথায় তাঁর আরও একটি দূরপাল্লার শট অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন জেটারস্ট্রম।
তবে অলিজের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত সম্ভবত কোনও শট নয়, বরং আদ্রিয়াঁ রাবিয়ো এবং জুল কুন্দের সঙ্গে মাঝমাঠে টানা এক মিনিট ধরে করা পাসের ত্রিভুজ। পায়ের ভেতর, বাইরের অংশ কিংবা আঙুলের ডগা—প্রতিটি স্পর্শে ছিল আলাদা গতি, ওজন ও নিখুঁততা। সেটিই যেন ফ্রান্সের এই দলের ফুটবল দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি।