466
সুমন চট্টোপাধ্যায়: সকালে ঘুম ভাঙার আগেই আমার বিবেকের ঘুম ভেঙে গেল।
কারণ, বিছানার পাশে টেবিলে একটি কার্ড পড়ে আছে। চকচকে কাগজে ছাপা। তাতে লেখা, আমাকে রেড রোডে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য সস্নেহ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমন এক অনুষ্ঠান, যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন, হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে যোগব্যায়াম করবেন, আর ড্রোন ক্যামেরা আকাশ থেকে সেই দৃশ্য ধারণ করবে।
আমার জীবনে বহু আমন্ত্রণ এসেছে। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, বইপ্রকাশ, স্মরণসভা, রাজনৈতিক সভা, এমনকি একবার এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁর দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীতেও আমন্ত্রণ করেছিলেন, যদিও প্রথম বিবাহবার্ষিকীতেও আমি যাইনি। কিন্তু এই আমন্ত্রণ অন্য রকম। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার ডাক নয়; এটি এক ধরনের নৈতিক, শারীরিক এবং দার্শনিক চ্যালেঞ্জ।
আমি যাব, না যাব না?
প্রশ্নটি মাথার মধ্যে এমনভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল, যেন ওয়াশিং মেশিনে আটকে পড়া এক জোড়া মোজা। প্রথম সমস্যা হল, আমি নিয়মিত ব্যায়াম করি না।সত্যি বলতে কী, ব্যায়ামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা সেই দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মতো, যিনি বছরে একবার ফোন করেন এবং প্রতি বারই জিজ্ঞেস করেন, “চিনতে পারছিস?”
যোগাসনের ছবি আমি দেখেছি। অন্যদের করতে দেখেছি। ইউটিউবে ভিডিও দেখেছি। কিন্তু নিজের শরীরকে সেইসব দেহ-বিভঙ্গের কঠিন অনুশীলনে নিয়ে যাওয়ার কোনও পূর্ব-অভিজ্ঞতাই নেই। আসনের মধ্যে প্রবেশ করানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মানবদেহের প্রতিটি অস্থিসন্ধির একটি ব্যক্তিগত মতামত আছে। আমার হাঁটু বহু আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে সে অতিরিক্ত উদ্যমের বিরোধী। কোমরও নিরপেক্ষ নয়। ঘাড় তো প্রায় বিরোধী দল।এ অবস্থায় হঠাৎ এক সকালে হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যদি সূর্যনমস্কারের চতুর্থ ধাপে পৌঁছে বুঝতে পারি যে আমার মেরুদণ্ড পঞ্চম ধাপে যেতে রাজি নয়?
তখন কি আলাদা করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হবে? নাকি আমাকে জাতীয় যোগ-উৎসবের এক ক্ষুদ্র শহিদ হিসেবে গণ্য করা হবে?
তবে এ সবের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা একটি বিশেষ আসনকে ঘিরে। পবনমুক্তাসন। যোগশাস্ত্রের বিচারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শরীর থেকে বায়ু নির্গমনের পথ সুগম করা। বিষয়টি শুনতে যতটা মার্জিত, বাস্তবে ততটা নয়। এখন ভাবুন, কলকাতার রেড রোডে কয়েক হাজার মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছেন। জুন মাসের সকাল। বাতাসে সামান্য আর্দ্রতা। চারদিকে ক্যামেরা, নিরাপত্তারক্ষী, গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিদেশি সংবাদমাধ্যম। ঠিক সেই সময় ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে এল—“এবার আমরা পবনমুক্তাসনে প্রবেশ করব।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাব। কারণ জীবনে কিছু কাজ ব্যক্তিগত পরিসরে করাই শ্রেয়। সভ্যতা আসলে সেই সব কাজের তালিকা, যেগুলো আমরা প্রকাশ্যে করি না।
যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়? যদি আশেপাশের দশজন হঠাৎ একই সঙ্গে আমার দিকে তাকায়? যদি সামনের সারির কোনও ভদ্রলোক এক মিনিটের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখেন?যদি পরে সংবাদমাধ্যম লেখে, “অনুষ্ঠানের কোনও এক জায়গায় অসহ্য দুর্গন্ধ কয়েকজন অতিথিকে পীডিত করে তুলেছিল, এছাডা মেগা যোগ দিবস মোটামুটি নির্বিঘ্নেই কেটেছে, তখন?আমি এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নই।
তারপর আছে নিরাপত্তা। যেখানে প্রধানমন্ত্রী থাকেন, সেখানে সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রবেশ করা অনেকটা কোনও মার্কিন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁডিয়ে থাকার মতো। আপনি যতই নিরীহ হোন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে আপনি সম্ভাব্য বিপদের উৎস।
আমার কল্পনায় ইতিমধ্যেই দৃশ্যটি তৈরি হয়ে গেছে। ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠেছি। চোখ আধবোজা। হাতে আমন্ত্রণপত্র।প্রথম ব্যারিকেড।দ্বিতীয় ব্যারিকেড। তৃতীয় ব্যারিকেড।তারপর একজন অফিসার জিজ্ঞেস করছেন—“আপনার কাছে কোনও ধাতব বস্তু আছে?” আমি বলছি, “আছে, দাঁতের মধ্যে দুটো ফিলিং।”
এরপর আরও পাঁচটি চেকিং।যখন অবশেষে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছব, তখন এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ব যে যোগব্যায়ামের আর প্রয়োজনই থাকবে না। শরীর ইতিমধ্যেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মধ্যে দিয়ে চলে যাবে।
তবে আসল বিপদ নিরাপত্তা নয়। আসল বিপদ বন্ধুরা। বন্ধুরা সব মনে রাখে। গত সাত দিন ধরে আমি যে রেড রোড বন্ধ থাকার কারণে বিরক্তি প্রকাশ করেছি, তারা সেটাও মনে রাখবে বিলক্ষণ।কেননা গত কয়েক দিন ধরে আমি ক্রমাগত বলে এসেছি “এই শহরে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে?” বলেছি, “একটা এত বড় আর প্রয়োজনীয় রাস্তা বন্ধ করতে হলে সাত দিন কেন লাগবে?”বলেছি, “গণতন্ত্রে নাগরিকেরও কিছু অধিকার আছে।”নীচু স্বরে যোগের নামে এমন মেগা-ধ্যাষ্টামি আয়োজনের সমালোচনাও বাদ যায়নি।
এখন যদি আমিই সেই রেড রোডে যোগাসনের মাদুর নিয়ে হাজির হই, তবে বন্ধুরা আমাকে ক্ষমা করবে না।তারা বলবে—“বাহ! এতদিন রাস্তা বন্ধ নিয়ে গজরাচ্ছিলি, আর শেষ পর্যন্ত নিজেই গিয়ে বসে পড়লি?” “কী হল? যোগপুরুষ হওয়ার বাসনা?” “আগামী বছর কি হিমালয়ে গিয়ে গুহায় ধ্যান করবে?বন্ধুত্বের ইতিহাসে বিদ্রুপের চেয়ে ধারালো অস্ত্র আর নেই।তবু বন্ধুদের প্যাঁকে গায়ে ফোসকা পড়েনা।
শেষ বিচারে এসব কোনওটাই সবচেয়ে গুরুতর নয়। সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় অনুষ্ঠানটি সকালে। খুব সকালে। এত সকালে যে আমার কাছে সেটি কার্যত রাতেরই সম্প্রসারণ।
আমি বহু বছর ধরে একটি সুসংহত জীবনদর্শন অনুসরণ করি। পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে— যারা ভোরে ওঠে, আর যারা তাদের সম্পর্কে লেখে।আমি দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ।ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম আমার কাছে কোনও যান্ত্রিক সংকেত নয়; এটি ব্যক্তিগত অপমান।আমি যখন সাধারণত ঘুমোতে যাই, তখন অনেক যোগসাধক জেগে ওঠার প্রস্তুতি নেন।এই জীবনযাত্রার মধ্যে হঠাৎ একদিন ভোরে উঠে রেড রোডে পৌঁছনো মানে টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার মতো আত্মত্যাগ।
আর সেখানেই এসে উপস্থিত হয় আমার চূড়ান্ত দুঃস্বপ্ন। শবাসন। যোগশাস্ত্র অনুযায়ী এটি গভীর প্রশান্তির আসন। আমার ক্ষেত্রে এটি গভীর নিদ্রার প্রবেশদ্বার। আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি।হাজার হাজার মানুষ নীরবে শুয়ে আছেন।প্রধানমন্ত্রী ধ্যানমগ্ন।চারদিকে নিস্তব্ধতা।ড্রোন ক্যামেরা আকাশে।সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
আর আমি?আমি অচেতনভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি। প্রথমে মৃদু নাসিকা-সঙ্গীত।তারপর ধীরে ধীরে শব্দের তীব্রতা বাড়ছে। একসময় পাশের ব্যক্তি চোখ খুলে তাকাচ্ছেন।তারপর আরও কয়েকজন। তারপর নিরাপত্তারক্ষী। তারপর ক্যামেরাম্যান। ড্রোনটি সম্ভবত কৌতূহলী হয়ে আমার ওপর চক্কর কাটছে।সন্ধ্যায় টেলিভিশনের পর্দায় খবর চলছে—“আজকের আন্তর্জাতিক যোগ দিবস অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শবাসনের সময় এমন নিষ্ঠার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন যে তিনি সরাসরি ঘুমিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাঁর নাক ডাকার শব্দ অনুষ্ঠানস্থলের অন্তত তিনটি মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে।”তখন আমি জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত। ভুল কারণে। তাই এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
যাব কি যাব না?
একদিকে স্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা, জাতীয় অনুষ্ঠান, সম্মানজনক আমন্ত্রণ।অন্যদিকে ঘুম, আলস্য, সামাজিক মর্যাদা এবং পবনমুক্তাসনের অনিশ্চিত পরিণতি।
আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে অ্যালার্ম ঘড়ি।যদি ভোরে অ্যালার্ম বেজে ওঠার পর আমি উঠে বসতে পারি, তাহলে হয়তো রেড রোডে যাব। আর যদি অ্যালার্ম বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ি, তাহলে সেটাকেও এক ধরনের যোগব্যায়াম হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।নামটা একটু খটমট— স্থায়ীনিদ্রাসন।
এই আসনে কোনও নিরাপত্তা তল্লাশি নেই, কোনও ড্রোন নেই, কোনও পবনমুক্তাসনের ঝুঁকি নেই। শুধু একটি বালিশ, একটি চাদর, এবং সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় ধ্যানপদ্ধতি।
কারণ, বিছানার পাশে টেবিলে একটি কার্ড পড়ে আছে। চকচকে কাগজে ছাপা। তাতে লেখা, আমাকে রেড রোডে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য সস্নেহ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমন এক অনুষ্ঠান, যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন, হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে যোগব্যায়াম করবেন, আর ড্রোন ক্যামেরা আকাশ থেকে সেই দৃশ্য ধারণ করবে।
আমার জীবনে বহু আমন্ত্রণ এসেছে। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, বইপ্রকাশ, স্মরণসভা, রাজনৈতিক সভা, এমনকি একবার এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁর দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকীতেও আমন্ত্রণ করেছিলেন, যদিও প্রথম বিবাহবার্ষিকীতেও আমি যাইনি। কিন্তু এই আমন্ত্রণ অন্য রকম। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার ডাক নয়; এটি এক ধরনের নৈতিক, শারীরিক এবং দার্শনিক চ্যালেঞ্জ।
আমি যাব, না যাব না?
প্রশ্নটি মাথার মধ্যে এমনভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল, যেন ওয়াশিং মেশিনে আটকে পড়া এক জোড়া মোজা। প্রথম সমস্যা হল, আমি নিয়মিত ব্যায়াম করি না।সত্যি বলতে কী, ব্যায়ামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা সেই দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মতো, যিনি বছরে একবার ফোন করেন এবং প্রতি বারই জিজ্ঞেস করেন, “চিনতে পারছিস?”
যোগাসনের ছবি আমি দেখেছি। অন্যদের করতে দেখেছি। ইউটিউবে ভিডিও দেখেছি। কিন্তু নিজের শরীরকে সেইসব দেহ-বিভঙ্গের কঠিন অনুশীলনে নিয়ে যাওয়ার কোনও পূর্ব-অভিজ্ঞতাই নেই। আসনের মধ্যে প্রবেশ করানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মানবদেহের প্রতিটি অস্থিসন্ধির একটি ব্যক্তিগত মতামত আছে। আমার হাঁটু বহু আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে সে অতিরিক্ত উদ্যমের বিরোধী। কোমরও নিরপেক্ষ নয়। ঘাড় তো প্রায় বিরোধী দল।এ অবস্থায় হঠাৎ এক সকালে হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যদি সূর্যনমস্কারের চতুর্থ ধাপে পৌঁছে বুঝতে পারি যে আমার মেরুদণ্ড পঞ্চম ধাপে যেতে রাজি নয়?
তখন কি আলাদা করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হবে? নাকি আমাকে জাতীয় যোগ-উৎসবের এক ক্ষুদ্র শহিদ হিসেবে গণ্য করা হবে?
তবে এ সবের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা একটি বিশেষ আসনকে ঘিরে। পবনমুক্তাসন। যোগশাস্ত্রের বিচারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শরীর থেকে বায়ু নির্গমনের পথ সুগম করা। বিষয়টি শুনতে যতটা মার্জিত, বাস্তবে ততটা নয়। এখন ভাবুন, কলকাতার রেড রোডে কয়েক হাজার মানুষ পাশাপাশি শুয়ে আছেন। জুন মাসের সকাল। বাতাসে সামান্য আর্দ্রতা। চারদিকে ক্যামেরা, নিরাপত্তারক্ষী, গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিদেশি সংবাদমাধ্যম। ঠিক সেই সময় ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে এল—“এবার আমরা পবনমুক্তাসনে প্রবেশ করব।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাব। কারণ জীবনে কিছু কাজ ব্যক্তিগত পরিসরে করাই শ্রেয়। সভ্যতা আসলে সেই সব কাজের তালিকা, যেগুলো আমরা প্রকাশ্যে করি না।
যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়? যদি আশেপাশের দশজন হঠাৎ একই সঙ্গে আমার দিকে তাকায়? যদি সামনের সারির কোনও ভদ্রলোক এক মিনিটের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখেন?যদি পরে সংবাদমাধ্যম লেখে, “অনুষ্ঠানের কোনও এক জায়গায় অসহ্য দুর্গন্ধ কয়েকজন অতিথিকে পীডিত করে তুলেছিল, এছাডা মেগা যোগ দিবস মোটামুটি নির্বিঘ্নেই কেটেছে, তখন?আমি এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নই।
তারপর আছে নিরাপত্তা। যেখানে প্রধানমন্ত্রী থাকেন, সেখানে সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রবেশ করা অনেকটা কোনও মার্কিন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁডিয়ে থাকার মতো। আপনি যতই নিরীহ হোন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে আপনি সম্ভাব্য বিপদের উৎস।
আমার কল্পনায় ইতিমধ্যেই দৃশ্যটি তৈরি হয়ে গেছে। ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠেছি। চোখ আধবোজা। হাতে আমন্ত্রণপত্র।প্রথম ব্যারিকেড।দ্বিতীয় ব্যারিকেড। তৃতীয় ব্যারিকেড।তারপর একজন অফিসার জিজ্ঞেস করছেন—“আপনার কাছে কোনও ধাতব বস্তু আছে?” আমি বলছি, “আছে, দাঁতের মধ্যে দুটো ফিলিং।”
এরপর আরও পাঁচটি চেকিং।যখন অবশেষে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছব, তখন এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ব যে যোগব্যায়ামের আর প্রয়োজনই থাকবে না। শরীর ইতিমধ্যেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মধ্যে দিয়ে চলে যাবে।
তবে আসল বিপদ নিরাপত্তা নয়। আসল বিপদ বন্ধুরা। বন্ধুরা সব মনে রাখে। গত সাত দিন ধরে আমি যে রেড রোড বন্ধ থাকার কারণে বিরক্তি প্রকাশ করেছি, তারা সেটাও মনে রাখবে বিলক্ষণ।কেননা গত কয়েক দিন ধরে আমি ক্রমাগত বলে এসেছি “এই শহরে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে?” বলেছি, “একটা এত বড় আর প্রয়োজনীয় রাস্তা বন্ধ করতে হলে সাত দিন কেন লাগবে?”বলেছি, “গণতন্ত্রে নাগরিকেরও কিছু অধিকার আছে।”নীচু স্বরে যোগের নামে এমন মেগা-ধ্যাষ্টামি আয়োজনের সমালোচনাও বাদ যায়নি।
এখন যদি আমিই সেই রেড রোডে যোগাসনের মাদুর নিয়ে হাজির হই, তবে বন্ধুরা আমাকে ক্ষমা করবে না।তারা বলবে—“বাহ! এতদিন রাস্তা বন্ধ নিয়ে গজরাচ্ছিলি, আর শেষ পর্যন্ত নিজেই গিয়ে বসে পড়লি?” “কী হল? যোগপুরুষ হওয়ার বাসনা?” “আগামী বছর কি হিমালয়ে গিয়ে গুহায় ধ্যান করবে?বন্ধুত্বের ইতিহাসে বিদ্রুপের চেয়ে ধারালো অস্ত্র আর নেই।তবু বন্ধুদের প্যাঁকে গায়ে ফোসকা পড়েনা।
শেষ বিচারে এসব কোনওটাই সবচেয়ে গুরুতর নয়। সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় অনুষ্ঠানটি সকালে। খুব সকালে। এত সকালে যে আমার কাছে সেটি কার্যত রাতেরই সম্প্রসারণ।
আমি বহু বছর ধরে একটি সুসংহত জীবনদর্শন অনুসরণ করি। পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে— যারা ভোরে ওঠে, আর যারা তাদের সম্পর্কে লেখে।আমি দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ।ভোর পাঁচটার অ্যালার্ম আমার কাছে কোনও যান্ত্রিক সংকেত নয়; এটি ব্যক্তিগত অপমান।আমি যখন সাধারণত ঘুমোতে যাই, তখন অনেক যোগসাধক জেগে ওঠার প্রস্তুতি নেন।এই জীবনযাত্রার মধ্যে হঠাৎ একদিন ভোরে উঠে রেড রোডে পৌঁছনো মানে টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার মতো আত্মত্যাগ।
আর সেখানেই এসে উপস্থিত হয় আমার চূড়ান্ত দুঃস্বপ্ন। শবাসন। যোগশাস্ত্র অনুযায়ী এটি গভীর প্রশান্তির আসন। আমার ক্ষেত্রে এটি গভীর নিদ্রার প্রবেশদ্বার। আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি।হাজার হাজার মানুষ নীরবে শুয়ে আছেন।প্রধানমন্ত্রী ধ্যানমগ্ন।চারদিকে নিস্তব্ধতা।ড্রোন ক্যামেরা আকাশে।সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
আর আমি?আমি অচেতনভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি। প্রথমে মৃদু নাসিকা-সঙ্গীত।তারপর ধীরে ধীরে শব্দের তীব্রতা বাড়ছে। একসময় পাশের ব্যক্তি চোখ খুলে তাকাচ্ছেন।তারপর আরও কয়েকজন। তারপর নিরাপত্তারক্ষী। তারপর ক্যামেরাম্যান। ড্রোনটি সম্ভবত কৌতূহলী হয়ে আমার ওপর চক্কর কাটছে।সন্ধ্যায় টেলিভিশনের পর্দায় খবর চলছে—“আজকের আন্তর্জাতিক যোগ দিবস অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি শবাসনের সময় এমন নিষ্ঠার সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন যে তিনি সরাসরি ঘুমিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাঁর নাক ডাকার শব্দ অনুষ্ঠানস্থলের অন্তত তিনটি মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে।”তখন আমি জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত। ভুল কারণে। তাই এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
যাব কি যাব না?
একদিকে স্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা, জাতীয় অনুষ্ঠান, সম্মানজনক আমন্ত্রণ।অন্যদিকে ঘুম, আলস্য, সামাজিক মর্যাদা এবং পবনমুক্তাসনের অনিশ্চিত পরিণতি।
আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে অ্যালার্ম ঘড়ি।যদি ভোরে অ্যালার্ম বেজে ওঠার পর আমি উঠে বসতে পারি, তাহলে হয়তো রেড রোডে যাব। আর যদি অ্যালার্ম বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ি, তাহলে সেটাকেও এক ধরনের যোগব্যায়াম হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।নামটা একটু খটমট— স্থায়ীনিদ্রাসন।
এই আসনে কোনও নিরাপত্তা তল্লাশি নেই, কোনও ড্রোন নেই, কোনও পবনমুক্তাসনের ঝুঁকি নেই। শুধু একটি বালিশ, একটি চাদর, এবং সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় ধ্যানপদ্ধতি।