Home দৃষ্টিভঙ্গিসুমন নামা সুরের অন্তরালে থাকা এক নক্ষত্র: সুমন কল্যাণপুরকে স্মরণ

সুরের অন্তরালে থাকা এক নক্ষত্র: সুমন কল্যাণপুরকে স্মরণ

0 comments 41 views 5 minutes read
A+A-
Reset
Suman Kalyanpur

ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের আকাশে কিছু নক্ষত্র এমন আছেন, যাঁরা কখনও সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয় দাঁড়াননি, কিন্তু তাঁদের আলো নিভে গেলে আকাশের এক অংশ হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে যায়। সুমন কল্যাণপুর (Suman Kalyanpur) ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। গত রবিবার, ৩১ মে ৮৯ বছর বয়সে তাঁর এই চিরবিদায় শুধু একজন গায়িকার মৃত্যু নয়; এটি ভারতীয় সংগীতের এক কোমল, মার্জিত এবং সুশীল যুগের অবসানের আরেকটি মর্মস্পর্শী স্মারক।

সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠস্বর ছিল নদীর জলের মতো স্বচ্ছ, সকালের শিশিরের মতো কোমল। তাঁর গান কখনও চিৎকার করে শ্রোতার মনোযোগ দাবি করেনি; বরং ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁর গান শুনেছেন কিন্তু অনেক সময় জানতেই পারেননি যে এটি সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠ। কারণ তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) স্বরের এক আশ্চর্য সাদৃশ্য ছিল। এই সাদৃশ্যই একদিকে তাঁকে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, অন্যদিকে তাঁর নিজস্ব পরিচয়কে অনেক সময় আড়ালও করে রেখেছিল।

কিন্তু ইতিহাসের কাছে শিল্পীর পরিচয় কখনও কেবল তুলনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। সুমন কল্যাণপুরের নিজস্বতা ছিল তাঁর গায়কির সংযমে, শব্দ উচ্চারণের স্বচ্ছতায় এবং আবেগকে কখনও অতিনাটকীয় না করে প্রকাশ করার অনন্য ক্ষমতায়। তিনি এমন এক সময়ের শিল্পী, যখন গানের সৌন্দর্যকে মাপা হতো কণ্ঠের কারুকার্য, সুরের শুদ্ধতা এবং অনুভূতির গভীরতায়। একজন মারাঠি পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর উর্দু এবং হিন্দি শব্দের নিখুঁত উচ্চারণ সেই সময়ের বড় বড় গীতিকারদেরও মুগ্ধ করত।

ষাট ও সত্তরের দশকের অসংখ্য স্মরণীয় গানে তাঁর কণ্ঠ মিশে আছে। মোহাম্মদ রফির (Mohammed Rafi) সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দি আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক বিশেষ সম্পদ। “আজ হুঁ না আয়ে বালম”, “না না করতে পেয়ার”, “তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে”— এইসব গান শুধু একটি যুগের স্মৃতি নয়, এক ধরনের সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যের প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে প্রেম ছিল কোমল, বেদনা ছিল মার্জিত, আর আবেগ ছিল সংযত।

এক সময় লতা মঙ্গেশকর ও মহম্মদ রফির মধ্যে রয়্যালটি সংক্রান্ত বিবাদের কারণে যখন দ্বৈত গান গাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ধারাকে সচল রেখেছিল সুমন কল্যাণপুর ও রফির যুগলবন্দি। সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি কেবল কারও বিকল্প নন, তিনি নিজেই এক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান। খৈয়াম, শঙ্কর-জয়কিষেন, রোশন বা মদন মোহনের মতো কিংবদন্তি সুরকারেরা সুমনের কণ্ঠের সূক্ষ্ম গাম্ভীর্যকে আলাদাভাবে চিনতেন। লতার কণ্ঠের পিচ যদি হতো আকাশছোঁয়া, সুমনের কণ্ঠে ছিল মাটির কাছাকাছি এক শান্ত গভীরতা। তাই তো “ইউঁহি দিল নে চাহা থা রোনা রুলানা”র মতো গভীর বিষাদের গান মদন মোহন তুলে দিয়েছিলেন সুমনের গলায়।

শুধু হিন্দি সিনেমা নয়, মারাঠি এবং বাংলা আধুনিক গানের জগতেও তাঁর কণ্ঠের জাদু ছড়িয়ে আছে। সলিল চৌধুরীর সুরে “তু মিছে আমায় ভালোবেসেছ” বা “মনে করো তুমি আমি”র মতো গানে তাঁর কণ্ঠের যে মায়াবী বিস্তার, তা বাঙালি শ্রোতারা কোনোদিন ভুলবে না। এছাড়াও পাঞ্জাবি, ওড়িয়া, অসমীয়া, গুজরাটি সহ ভারতের একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর কণ্ঠের অনায়াস যাতায়াত ছিল।

সুমন কল্যাণপুরের জীবন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রতিভা সব সময় প্রচারের আলোয় থাকে না। কখনও কখনও ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়েও একজন শিল্পী তাঁর কাজের মাধ্যমে অমর হয়ে ওঠেন। তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে কেউ কেউ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছেন, কেউ হয়েছেন সাংস্কৃতিক আইকন। কিন্তু জীবনকে এবং নিজের ক্যারিয়ারকে তিনি যেভাবে আভিজাত্যের সাথে সামলেছেন, তা বর্তমানের আত্মপ্রচারসর্বস্ব যুগের একেবারে বিপরীত। যখন তিনি দেখলেন যে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের দলাদলি বা নোংরা রাজনীতি তাঁর সংগীত সাধনার নির্মলতায় আঘাত করছে, তিনি কোনো প্রতিবাদ বা ক্ষোভ না দেখিয়ে নীরবে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। নিজের আঁকার খাতা আর তুলি নিয়ে ফিরে গেলেন তাঁর প্রথম ভালোবাসা—চিত্রশিল্পের কাছে। ‘স্যার জে. জে. স্কুল অব আর্ট’-এর এই প্রাক্তনী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্যানভাসে রঙ মেখেছেন, অথচ নিজের কণ্ঠের অহংকার কোনোদিন কাউকে দেখাননি।

আজ যখন তাঁর প্রয়াণের সংবাদ আসে, তখন মনে পড়ে যায় ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের সেই সোনালি যুগের কথা। একে একে সেই যুগের কণ্ঠস্বরগুলি হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে সুরকার, গীতিকার ও গায়কের যৌথ সৃষ্টিশীলতাই ছিল প্রধান। আজকের দ্রুতগামী সময়ে সেই ধৈর্য, সেই সূক্ষ্মতা, সেই নান্দনিকতা যেন ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। খ্যাতির কোলাহলের চেয়ে সুরের সাধনাকেই যিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ ব্রত মনে করেছিলেন, তাঁর এই চলে যাওয়া ভারতীয় লঘু ও শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

খ্যাতি বা পুরস্কারের পরিমাপ দিয়ে সুমন কল্যাণপুরের মতো শিল্পীকে মাপা যায় না। তিনি ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ (Padma Bhushan)-এর মতো রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল পুরস্কার রয়ে গেছে সেইসব সংবেদনশীল শ্রোতাদের হৃদয়ে। তিনি ছিলেন সেই অন্তরাল, যা মূল সুরকে ধরে রাখে অথচ নিজে আড়ালে থাকে।

তবু শিল্পীর মৃত্যু কখনও তাঁর শেষ পরিণতি নয়। কারণ মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেকে যায়। কোনও এক বর্ষার বিকেলে, কোনও এক নিঃসঙ্গ রাতে, কিংবা পুরনো রেডিওর তরঙ্গে হঠাৎ ভেসে আসা কোনও সুরে আবার ফিরে আসবেন সুমন কল্যাণপুর। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁর নাম জানবে না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য অনুভব করবে।

স্মৃতিরও এক নিজস্ব সংগীত আছে। সেই সংগীতে আজ মিশে আছে সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠ। তাঁর গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কোমলতাও শক্তি হতে পারে, সংযমও গভীর আবেগ প্রকাশ করতে পারে, আর নিঃশব্দ সৌন্দর্যও যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

বিদায়, সুমন কল্যাণপুর। আপনি হয়তো আর নতুন কোনো গান শোনাবেন না। কিন্তু যে সুরের মালা আপনি রেখে গেলেন, তার প্রতিটি মুক্তো ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল দীপ্ত হয়ে থাকবে। আপনার কণ্ঠের সেই নির্মল আবেশ, সেই অনাড়ম্বর সৌন্দর্য এবং সেই গভীর মানবিকতা আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে যতদিন বাংলা, হিন্দি কিংবা ভারতীয় সংগীতের কোনও শ্রোতা অতীতের দিকে ফিরে তাকাবে।

সুর থেমে যায় না। শিল্পীর জীবন শেষ হয়, কিন্তু গান থেকে যায়। আর সেই গানেই বেঁচে থাকবেন সুমন কল্যাণপুর।

Author

  • সুমন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯৫৭) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, সম্পাদক এবং লেখক, যিনি তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অনন্য রচনাশৈলীর জন্য সুপরিচিত। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে আজকাল পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৫ বছর আনন্দবাজার পত্রিকা-র কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারত ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, ভূ-রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সাহসিকতার সাথে কভার করার পাশাপাশি স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি ও তারা বাংলার মতো টেলিভিশন মাধ্যমেও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব সংবাদপত্র একদিন চালু করেন এবং ২০১২ সালে 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া' গ্রুপের বাংলা দৈনিক এই সময়-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ 'বাংলাস্ফিয়ার' (Banglasphere)-এ নিয়মিত বস্তুনিষ্ঠ লেখা ও মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে মাই ডেট উইথ হিস্ট্রি, প্রথম নাগরিক, সেদিনের সপ্তারোহীগুমঘর গুলজার-এর মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles