Home খবর শাহি জমানায় কেমন ছিল ইরান

শাহি জমানায় কেমন ছিল ইরান

Iran during pre-revolution era

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 540 views 12 minutes read
A+A-
Reset
Iran during pre-revolution era

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে প্রায়ই একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের গল্প হিসেবে বলা হয়। এই গল্পে বিপ্লবের আগে দেশটি ছিল আত্মাহীন, পশ্চিমের অনুকরণে বিভ্রান্ত, ধর্মহীন এবং সামাজিকভাবে পচে যাওয়া। এই বয়ানটি এতটাই শক্তিশালী যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি ইতিহাসের জায়গা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি দ্বন্দ্বপূর্ণ, এবং সেই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত ইরানকে ১৯৭৯-এর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

আয়াতোল্লা খোমেইনি ক্ষমতায় আসার আগে ইরান কোনো শূন্যগর্ভ সমাজ ছিল না। সেটি ছিল এক ধরনের অসম্পূর্ণ আধুনিকতা—যেখানে রাষ্ট্র দ্রুত বদলাচ্ছিল, কিন্তু সমাজ সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না; যেখানে উন্নয়ন হচ্ছিল, কিন্তু অংশগ্রহণ হচ্ছিল না; যেখানে সংস্কৃতি ফুলে উঠছিল, কিন্তু রাজনীতি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ছিল। এই অসম্পূর্ণতাই ছিল বিপ্লবের সবচেয়ে বড় জ্বালানি।

খোমেইনির আগের ইরানকে বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হয় পাহলভি রাষ্ট্রের মানসিকতা। ১৯২৫ সালে রেজা শাহ পাহলভির হাত ধরে যে আধুনিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়, তার মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত সরল: একটি শক্তিশালী, কেন্দ্রীয়, আধুনিক রাষ্ট্রই একটি পশ্চাৎপদ সমাজকে টেনে তুলতে পারে। এই দর্শনে জনগণ ছিল রাষ্ট্রের প্রকল্পের বিষয়বস্তু, অংশীদার নয়। শিক্ষা, পোশাক, প্রশাসন, নগরায়ণ—সবকিছুই উপর থেকে নীচে নামানো হয়েছিল।

এই প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটে তাঁর পুত্র রেজা শাহ পাহেলভির আমলে। বিশেষ করে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইরান অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। তেল রাজস্ব রাষ্ট্রকে এমন এক ক্ষমতা দেয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের খুব কম দেশের হাতে ছিল। নতুন রাস্তা, বিমানবন্দর, বাঁধ, স্টিল কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল—সবকিছু দ্রুত গড়ে উঠছিল। তেহরান, ইসফাহান, শিরাজের মতো শহরগুলো বদলে যাচ্ছিল নগরের ভাষায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ফুলে উঠছিল। মেয়েরা কাতারে কাতার উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইরানকে তুলে ধরা হচ্ছিল একটি “উদীয়মান আধুনিক রাষ্ট্র” হিসেবে।

কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে একটি গভীর সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। এই আধুনিকতা ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক, নাগরিককেন্দ্রিক নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত। নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিক। সংসদ কার্যত একটি অনুমোদন মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। সমালোচনার জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছিল। রাষ্ট্রের উন্নয়ন নাগরিককে ক্ষমতাবান না করে বরং নির্ভরশীল করে তুলছিল। উন্নয়ন ছিল, কিন্তু সম্মান ছিল না।

এই দ্বন্দ্বটি বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে তীব্র হয়ে ওঠে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, বিদেশে যাচ্ছে, আধুনিক পেশায় ঢুকছে—কিন্তু নিজেদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তারা দেখছে উন্নয়ন, কিন্তু অনুভব করছে অবমাননা। এই মানসিক ক্ষতই ছিল পাহলভি ইরানের সবচেয়ে বিপজ্জনক উত্তরাধিকার।

গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই চিত্র আরও আলাদা ছিল। ভূমি সংস্কার আংশিকভাবে সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু নতুন স্থিতিশীলতা দেয়নি। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন বাড়ছিল। শহরের উপকণ্ঠে বস্তি গড়ে উঠছিল। রাষ্ট্রের আধুনিকীকরণ প্রকল্প গ্রামীণ সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে বারেবারে সংঘাতে যাচ্ছিল। ফলে একদিকে শহুরে আধুনিকতার প্রদর্শনী, অন্যদিকে গ্রামীণ ক্ষোভ—এই দুই বাস্তবতা একসঙ্গে ইরানের সমাজকে টানটান করে তুলেছিল।

এই পরিস্থিতিতে ধর্ম কখনও অদৃশ্য হয়ে যায়নি। পাহলভি রাষ্ট্র ধর্মকে প্রান্তে ঠেলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু মুছে ফেলতে পারেনি। মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় দানব্যবস্থা,সবই সমাজের গভীরে ছিল। রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক বিরোধিতার সব পথ বন্ধ করে দিচ্ছিল, তখন ধর্ম ধীরে ধীরে সেই বিরোধিতার ভাষা হয়ে উঠছিল। ধর্ম এখানে কেবল বিশ্বাস ছিল না; এটি ছিল নেটওয়ার্ক, শৃঙ্খলা, ভাষা এবং নৈতিক বৈধতার উৎস।

এইখানেই খোমেইনির গুরুত্ব। তিনি কোনও শূন্য জায়গায় প্রবেশ করেননি। তিনি প্রবেশ করেছিলেন একটি সমাজে, যেখানে রাষ্ট্র শক্তিশালী কিন্তু একাকী, যেখানে উন্নয়ন দৃশ্যমান কিন্তু অসম্মান অনুভূত, যেখানে সংস্কৃতি জীবন্ত কিন্তু রাজনীতি মৃতপ্রায়। খোমেইনি এই ফাঁকটি বুঝেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষ কেবল উন্নয়ন নয়, অর্থ, নৈতিকতা ও সম্মানের ভাষা চায়। রাষ্ট্র যেখানে কেবল ভবিষ্যতের কথা বলছিল, তিনি সেখানে বর্তমানের যন্ত্রণা নাম দিয়ে ডাকছিলেন।

খোমেইনির আগে ইরান তাই কোনো “পাপী রাষ্ট্র” ছিল না, আবার কোনো সফল গণতন্ত্রও ছিল না। সেটি ছিল এক ধরনের অসম্পূর্ণ সভ্যতা,যেখানে অনেক কিছু ছিল, কিন্তু একসঙ্গে ছিল না। এই অসম্পূর্ণতাই বিপ্লবকে সম্ভব করে তোলে।

অস‍্যার্থ, ইসলামি বিপ্লব কোনো পশ্চাৎপদ সমাজকে জাগিয়ে তোলেনি। সে একটি আধুনিকায়নের ব্যর্থ প্রকল্পের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নিয়েছিল। পাহলভি রাষ্ট্র ইরানকে বদলাতে চেয়েছিল, কিন্তু ইরানকে নিজের কথা বলতে দেয়নি। ইতিহাসে এই ভুলের মূল্য সবসময় ভয়ংকর হয়।

    (২)

তেল।ইরানের বিপ্লব-পূর্ব সমাজকে আরও গভীরে বোঝার জন্য এই জ্বালানির সামাজিক অভিঘাত বোঝা আবশ‍্যক। তেল যেমন ইরানে সমৃদ্ধি আনে তেমনই বাইরে থেকে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিল তেমনি সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল। তেল শুধু ইরানের অর্থনীতিকে বদলায়নি, সেদেশের রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্ককেও আমূল রূপান্তরিত করেছিল। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে তেল রাজস্বের বিস্ফোরণ পাহলভি রাষ্ট্রকে এমন এক ক্ষমতা দেয় যা তাকে নাগরিকদের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল না হয়েও শাসন চালানোর সুযোগ করে দেয়। রাষ্ট্র কর আদায়কারী থেকে রূপ নেয় বণ্টনকারী শক্তিতে। উন্নয়ন আর নাগরিক অধিকারের মধ্যে যে দরকষাকষি গণতন্ত্রে স্বাভাবিক, ইরানে তার প্রয়োজনই পড়ে না।

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নাগরিককে আর অংশীদার হিসেবে দেখে না, দেখে ভোক্তা হিসেবে। স্কুল, হাসপাতাল, চাকরি, সবকিছুই রাষ্ট্র দেয়। বিনিময়ে রাষ্ট্র চায় নীরবতা। এই নীরবতা প্রথমে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। কারণ দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছিল। শহরে জীবন বদলাচ্ছিল। গাড়ি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মধ‍্যবিত্তের ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছিল।কিন্তু এই ভোগের রাজনীতির একটি সীমা আছে। যখন মানুষ কেবল সুবিধা পায়, কিন্তু সিদ্ধান্তের অধিকার পায় না, তখন সেই সুবিধাই একসময় অপমান বলে মনে হয়।

এই অপমানবোধ শহরের শিক্ষিত শ্রেণিতে যেমন ছিল, তেমনই ছিল ঐতিহ্যবাহী বাজার-কেন্দ্রিক সমাজে। ইরানের বাজার শুধু অর্থনৈতিক স্থান ছিল না এটি ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় নেটওয়ার্কের কেন্দ্র। দোকানদার, ধর্মীয় শিক্ষালয়, দানব্যবস্থা, সবকিছু এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পাহলভি জমানার আধুনিকীকরণ এই বাজার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশন ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে জায়গা করে দিচ্ছিল। এর ফলে বাজারভিত্তিক শ্রেণিগুলি নিজেদের প্রান্তিক বোধ করতে শুরু করে। তারা দেখছিল, দেশের উন্নয়ন হলেও তারা তার শরিক নয়।

এই বঞ্চনাবোধকেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব‍্যবহার করে।মসজিদ, হোসেইনিয়া, ধর্মীয় বক্তৃতা,এসব ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে ক্ষোভের সামাজিক মঞ্চ। এখানে কেউ উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলত না,কথা হতো ন্যায়, অবিচার, অপমান আর মর্যাদা নিয়ে। রাষ্ট্র যে ভাষায় কথা বলছিল, পরিকল্পনা, প্রবৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলেনি। ধর্মীয় ভাষা সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল।

এই ধর্মীয় পরিসরকে ভুল করে “পশ্চাৎপদ” বলা হয়েছিল। বাস্তবে এটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক এক সামাজিক নেটওয়ার্ক যেখানে দ্রুত তথ্য ছড়াত, যেখানে বিশ্বাস ছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় সেন্সরের বাইরে কথা বলা যেত। রাজনীতি যখন নিষিদ্ধ, তখন ধর্ম হয়ে ওঠে রাজনীতির আশ্রয়। এই প্রক্রিয়ায় ধর্ম নিজেও বদলাতে থাকে, ব্যক্তিগত আচার থেকে গণসমাবেশের ভাষায়।

এই একই সময় ইরানের সংস্কৃতি এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতায় বন্দী হয়ে গিয়েছিল।একদিকে ছিল আধুনিকতার প্রদর্শনী, আন্তর্জাতিক উৎসব, পশ্চিমি চলচ্চিত্র, শিল্প প্রদর্শনী, ফ্যাশন। অন্যদিকে ছিল গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। তেহরানের সিনেমা হলে যে ছবি চলত, তাতে অনেক সময় দেশের বড় অংশের মানুষের জীবন প্রতিফলিত হোতনা। সংস্কৃতি এখানে মুক্তির জায়গা ছিল বটে কিন্তু একই সঙ্গে তা রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। সেন্সরশিপ ছিল সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী। প্রশ্ন তোলা যেত, কিন্তু সীমার মধ্যে।

নারীদের অবস্থান এই দ্বৈততার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। বিপ্লবের আগে ইরানে মহিলারা আইনগতভাবে অনেক স্বাধীনতা পেয়েছিল। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল, পেশায় ঢুকছিল, শহুরে জীবনে দৃশ্যমান হচ্ছিল। কিন্তু এই পরিবর্তন ছিল অসম। শহরের মধ্যবিত্ত নারীর অভিজ্ঞতা আর গ্রামীণ বা ধর্মপ্রাণ পরিবারের মহিলাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল বিশাল ফারাক। প্রশাসন নারীর মুক্তিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিল, আধুনিকতার প্রমাণ হিসেবে। কিন্তু সমাজের ভেতরের টানাপোড়েনকে সে সামলাতে পারেনি। ফলে নারী-স্বাধীনতা একদিকে আশার প্রতীক, অন্যদিকে ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই ক্ষোভের রাজনীতিতে খোমেইনির উত্থান কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। তিনি একমাত্র নেতা ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন সবচেয়ে দক্ষ বাতিক-শিল্পী।রাষ্ট্র যে ভাষায় ব্যর্থ হয়েছিল তিনি সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে শব্দে রূপ দিতে পেরেছিলেন। তিনি উন্নয়নের বিরুদ্ধে কথা বলেননি, তিনি অপমানের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তিনি পশ্চিমের বিরুদ্ধে কথা বলেননি তিনি আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। তাঁর ভাষা গ্রাম ও শহর, বাজার ও মসজিদ, সব জায়গায় পৌঁছেছিল, কারণ সেটি মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেছিল।

এই পর্যায়ে এসে ইরান এমন এক অবস্থানে দাঁড়ায় যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে আর কোনো মধ্যস্থতাকারী নেই। রাজনৈতিক দল নেই, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেই, বিশ্বাসযোগ্য সংসদ নেই। এই শূন্যতায় ধর্মীয় নেতৃত্ব একমাত্র সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিপ্লব তাই হঠাৎ বিস্ফোরণ নয় এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসামঞ্জস্যের ফল।

খোমেইনির আগে ইরান তাই এক অর্থে আধুনিক ছিল আর এক অর্থে ছিল গভীরভাবে অস্থির। উন্নয়ন চলছিল কিন্তু সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংলাপ বন্ধ ছিল। সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিল কিন্তু রাজনীতি শুকিয়ে যাচ্ছিল। ধর্ম প্রান্তে ছিল কিন্তু মানুষের হৃদয়ে ছিল বহাল তবিয়তে। এইসব বিপরীত স্রোত একসময় একটি বিন্দুতে মিলিত হয় ১৯৭৯ সালে।

এই বিন্দুতে এসে একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলাই যায়। যদি পাহলভি ইরান একটু বেশি শোনার ক্ষমতা রাখত যদি উন্নয়নের সঙ্গে মর্যাদা যুক্ত করতে পারত, যদি রাজনীতিকে সম্পূর্ণ বন্ধ না করত, তাহলে কি এই পরিণতি অনিবার্য ছিল? ইতিহাসে “যদি” শব্দটির কোনও মূল্য নেই, কিন্তু এই প্রশ্নটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে বিপ্লব কেবল ধর্মীয় আবেগের ফল নয় এটি ছিল একটি ব্যর্থ সামাজিক চুক্তির পরিণতি।

তেলের অর্থে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রযন্ত্র তখন আকারে বিশাল, কিন্তু আত্মায় শূন্য। আমলাতন্ত্র ফুলে উঠেছে, নিরাপত্তা কাঠামো সর্বত্র, গোপন পুলিশ মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনেও ছায়া ফেলছে। রাষ্ট্র যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে নাগরিক তত বেশি খর্বকায় হয়ে যাচ্ছে। ভয় এখানে শুধু গ্রেফতাারের নয়ভয় হলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার। রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয়, রাষ্ট্র ব্যাখ্যা দেয়, রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। সাধারণ মানুষ কেবল তার ফল ভোগ করে।
এই সময়েই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অস্থির হয়ে ওঠে। শিক্ষিত যুবসমাজ যারা এই আধুনিকতার সবচেয়ে বড় সুফলভোগী তারাই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করে। তারা পশ্চিমি বই পড়ে, দুনিয়ার খবর জানে, নিজেদের সক্ষম মনে করে, কিন্তু নিজেদের দেশে তারা কেবল দর্শক বৈ কিছুই নয়। এই অসহায় দর্শকের ক্লান্তিকর অবস্থান দীর্ঘদিন সহ্য করা যায় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো হয়ে ওঠে ক্ষোভের পরীক্ষাগার। কখনও বামপন্থী ভাষায়, কখনও জাতীয়তাবাদী স্লোগানে, কখনও নিছক প্রতিবাদে।কিন্তু সবক্ষেত্রেই মূল অনুভূতিটি এক: এই শাহি জমানা আমাদের কথা শোনে না।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল পরিচিত—নিয়ন্ত্রণ। দমন। নজরদারি। কিন্তু এই দমন একটি মৌলিক ভুল করেছিল। সে ধরে নিয়েছিল, রাজনীতি মানেই সংগঠিত দল, পরিচিত নেতা, দৃশ্যমান শত্রু। বাস্তবে রাজনীতি তখন রূপ বদলাচ্ছিল। সংগঠনের বদলে নেটওয়ার্ক, বক্তৃতার বদলে ধর্মীয় উপাখ্যান, পার্টির বদলে মসজিদ,এই রূপান্তর রাষ্ট্র পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

ধর্মীয় আচার এখানে একটি অপ্রত্যাশিত ভূমিকা নেয়। মহররমের শোকমিছিল, কারবালার গল্প, শাহাদাতের বয়ান, এসব কেবল ধর্মীয় স্মৃতি ছিল না, হয়ে ওঠে রাজনৈতিক রূপক। নিপীড়িত বনাম অত্যাচারী, ন্যায় বনাম শক্তি এই দ্বৈততা মানুষ নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে শুরু করে। রাষ্ট্র যে ভাষায় কথা বলতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেই ভাষাই ধর্মের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, নৈতিকতার ভাষা, অপমানের ভাষা, প্রতিরোধের ভাষা।

এই পর্যায়ে এসে পাহলভি জমানার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: সে সমাজের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। তার ভাষা ছিল পরিসংখ্যান, প্রকল্প, আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সমাজের ভাষা ছিল অভিজ্ঞতা, ক্ষোভ, স্মৃতি। এই দুই ভাষার মধ্যে কোনো অনুবাদক ছিল না। রাজনীতি যেখানে কথা বলার সেতু হওয়া উচিত ছিল, সেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত।

এই শূন্যতায় যে শক্তি সবচেয়ে দক্ষভাবে প্রবেশ করে, তা হলো ধর্মীয় নেতৃত্ব বিশেষ করে খোমেইনি। তাঁর গুরুত্ব এখানেই যে তিনি নতুন কোনও ক্ষোভ তৈরি করেননি; তিনি বিদ্যমান ক্ষোভকে নাম দিয়েছেন। তিনি মানুষকে নতুন কিছু বিশ্বাস করতে বলেননি, তিনি তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাকে বৈধতা দিয়েছেন। রাষ্ট্র যেখানে বলছিল “সব ঠিক আছে”, তিনি বলছিলেন “তোমাদের অপমান করা হয়েছে।” এই বাক্যটি ছিল বিস্ফোরক, কারণ সেটি সত্য বলে মনে হয়েছিল।
শেষ বছরগুলোতে এই সব উপাদান একসঙ্গে গতি পায়। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি মন্থর হয়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, শহরে বেকারত্ব দৃশ্যমান হয়। উন্নয়ন যে নিরাপত্তা দেবে এই বিশ্বাস ভেঙে যায়। রাষ্ট্র তখন আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিয়েও মানুষকে শান্ত করতে পারে না। কারণ মানুষ বর্তমানেই নিরাপদ বোধ করছে না।

এই সময় রাজতন্ত্র নিজের বৈধতা রক্ষার জন্য প্রতীকী প্রদর্শনীতে আরও বেশি জোর দেয়, উৎসব, অনুষ্ঠান, জাতীয়তাবাদী আড়ম্বর। কিন্তু এই আড়ম্বর সমাজের এক বড় অংশের কাছে হয়ে ওঠে বেদনাদায়ক দূরত্বের প্রতীক। রাষ্ট্র উৎসব করছে, সমাজ শোক পালন করছে, এই দৃশ্যগত বৈপরীত্যই বিপ্লবের মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।

খোমেইনির আগে ইরান তাই শেষ পর্যন্ত এমন এক সমাজে পরিণত হয়, যেখানে সবাই কিছু না কিছু হারিয়েছে। মধ্যবিত্ত হারিয়েছে রাজনৈতিক মর্যাদা, গ্রামীণ সমাজ হারিয়েছে স্থিতি, ধর্মীয় শ্রেণী হারিয়েছে সামাজিক কেন্দ্রীয়তা, যুবসমাজ হারিয়েছে ভবিষ্যৎ কল্পনার জায়গা। রাষ্ট্র এই হারানোর গল্পগুলো একসঙ্গে ধরতে পারেনি। বিপ্লব সেই হারানোর অনুভূতিগুলোকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসে।

এই পর্যায়ে বিপ্লব আর কোনও মতাদর্শের বিষয় থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক অভ্যাস। মানুষ রাস্তায় নামে, কারণ অন্যরাও নামছে। নীরব থাকা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ভয় তখনও থাকে, কিন্তু ভয় আর আচরণ নির্ধারণ করে না। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই ছিল সবচেয়ে গভীর রূপান্তর।

খোমেইনি ক্ষমতায় আসার আগের ইরান তাই কোনো একরৈখিক গল্প নয়। এটি ছিল সম্ভাবনার দেশ, যা নিজের সম্ভাবনাকে ধারণ করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল। আধুনিকতা এসেছিল, কিন্তু আত্মসম্মান আসেনি। সংস্কৃতি ছিল, কিন্তু রাজনীতি ছিল না। রাষ্ট্র শক্তিশালী ছিল, কিন্তু সম্পর্কহীন।

মতাদর্শের ঘোষণা ছিল না, ছিল এক ধরনের সামাজিক স্বস্তির বিস্ফোরণ। বহু বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান, অবিশ্বাস হঠাৎ করে একটি অভিন্ন ছন্দ পেয়ে যায়। মানুষ রাস্তায় নামে শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, নিজেদের দীর্ঘ নীরবতার বিরুদ্ধেও। এই নীরবতা ভাঙার মুহূর্তটিই ছিল সবচেয়ে বিপজ্জনক, এবং সবচেয়ে মুক্তিদায়ক।

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে ইরানের শহরগুলোতে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা কোনও পরিকল্পিত বিপ্লবের চিত্রনাট্য ছিল না। এটি ছিল একের পর এক স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ, শোকমিছিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ছাত্র বিক্ষোভ যেগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্র প্রতিবারই ভেবেছিল, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সমাজ প্রতিবারই দেখেছিল, এটি একে অপরের প্রতিচ্ছবি। এই ভুল বোঝাবুঝিই ছিল পাহলভি রাষ্ট্রের শেষ বড় ব্যর্থতা।

এই সময় রাজতন্ত্রের ভাষা আরও অচল হয়ে ওঠে। সমঝোতার চেষ্টা আসে দেরিতে, আর তা আসে উপরের দিক থেকে। ক্ষমা, সংস্কার, রাজনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি সবকিছুই শোনায় কৌশলগত, আন্তরিক নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র মানুষের কথা শোনেনি, শেষ মুহূর্তে মানুষের রাষ্ট্রের কথা শোনার কোনো কারণ ছিল না। বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা আর সদিচ্ছার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায়না।
এই পর্যায়ে খোমেইনি নিজে খুব বেশি কিছু বলার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তাঁর ভাষা আগেই মানুষের মনে ঢুকে গিয়েছিল। তাঁর অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে উঠেছিল। ফরাসি নির্বাসন থেকে পাঠানো বার্তা, ক্যাসেট টেপে ছড়িয়ে পড়া বক্তৃতা,এসব ছিল এক ধরনের নৈতিক আশ্রয়। রাষ্ট্র যখন আর কোনো নৈতিক গল্প বলতে পারছিল না, তখন খোমেইনির ভাষা সেই শূন্যতা পূরণ করেছিল।

বিপ্লবের মুহূর্তে ইরানের সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেছিল, যে ভুল প্রায় সব বিপ্লবই করে। তারা ভেবেছিল, রাষ্ট্র ভাঙলেই সমাজ মুক্ত হবে। কিন্তু রাষ্ট্র ভাঙা আর সমাজ গড়া এক জিনিস নয়। পাহলভি রাষ্ট্রের যে কাঠামোগত সমস্যাগুলো ছিল অংশগ্রহণের অভাব, মধ্যস্থতাকারীর সংকট, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ,তার অনেকগুলোই রয়ে গিয়েছিল। শুধু ক্ষমতার ভাষা বদলে গিয়েছিল।

খোমেইনি ক্ষমতায় আসার পর খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায়, বিপ্লব-পূর্ব ইরানের বহু সম্ভাবনা আর ফিরে আসবে না। যে সংস্কৃতি বহুমাত্রিক ছিল তা সন্দেহের চোখে দেখা হতে শুরু করে। যে নারী-স্বাধীনতা আইনগতভাবে সীমিত হলেও সামাজিকভাবে এগোচ্ছিল তা নতুন নৈতিকতার কাঠামোয় আটকে যায়। যে ধর্ম একসময় বিরোধিতার আশ্রয় ছিল তা রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

এই পরিণতিগুলো বোঝার জন্য আবার ফিরে তাকাতে হয় বিপ্লব-পূর্ব ইরানের দিকে। কারণ বিপ্লব যা কিছু বন্ধ করে দেয়, তার অনেকটাই জন্ম নিয়েছিল আগের যুগে। পাহলভি ইরানের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সম্ভাবনার বিস্তার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিশ্বসংযোগ। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল সেই সম্ভাবনাগুলোর জন্য রাজনৈতিক জায়গা তৈরি করতে না পারা। বিপ্লব সেই ব্যর্থতাকে শাস্তি দিয়েছিল।একই সঙ্গে সম্ভাবনাগুলোকেও।

এইখানেই ইতিহাসের নির্মমতা। সমাজ যখন দীর্ঘদিন কথা বলার সুযোগ পায় না, তখন সে যে ভাষায় কথা বলে তা প্রায়শই অতিরিক্ত হয়ে যায়। ইরানের ইসলামি বিপ্লব সেই অতিরিক্ততার এক ক্লাসিক উদাহরণ। এটি কোনও অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার গল্প নয়,এটি একটি জটিল সমাজের নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্বে ভেঙে পড়ার গল্প।

খোমেইনি ক্ষমতায় আসার আগের ইরান তাই কেবল একটি হারানো অতীত নয় এটি একটি সতর্কবার্তা। উন্নয়ন যদি মর্যাদাহীন হয় আধুনিকতা যদি অংশগ্রহণহীন হয়, সংস্কৃতি যদি রাজনীতিহীন হয় তাহলে সেই সমাজ যতই উজ্জ্বল দেখাক না কেন, তার ভিতরে ফাটল তৈরি হয়। সেই ফাটল একদিন দৃশ্যমান হয়। তখন ইতিহাস আর ধীরে চলে না।

 

কারণ ভবিষ্যৎ সবসময় অতীতের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles