Table of Contents
ইউক্রেন যুদ্ধ, ড্রোন হামলা ও অর্থনৈতিক সংকটে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন
এক সময় মনে করা হতো, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin যেন রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এমন এক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন একাই। কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে সেই অটল চেহারাটিতেই দেখা যাচ্ছে চিড়। ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার বিস্তার, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা এবং শাসকগোষ্ঠীর অন্দরে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে পুতিন এখন এমন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা তাঁর ক্ষমতার দীর্ঘ ইতিহাসে বিরল।
নিরাপত্তা-বেষ্টনীতে ঘেরা এক নেতা
মে মাসের শেষে Astana সফরে গিয়ে পুতিন যেন নিজের অজান্তেই তাঁর উদ্বেগের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বহরে ছিল প্রায় বিশটি গাড়ি, মোটরসাইকেল এসকর্ট, মেশিনগান-সজ্জিত নিরাপত্তা যান, অ্যান্টি-ড্রোন জ্যামিং সিস্টেম এবং নজরদারি হেলিকপ্টার।
পুতিন বরাবরই নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক। কিন্তু এবার পর্যবেক্ষকদের চোখে পড়েছে অন্য বিষয়—তিনি যেন ক্রমশ বেশি ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কা।
কারণ সেই ভয় অমূলক নয়। গত কয়েক মাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন মস্কো ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, সামরিক বিমানঘাঁটি, প্রতিরক্ষা শিল্প কারখানা, তেল শোধনাগার এবং বন্দরগুলিতে একের পর এক আঘাত হেনেছে। যুদ্ধের প্রথম দিকের তুলনায় এখন ইউক্রেনের হামলা অনেক বেশি গভীরে প্রবেশ করছে।
ড্রোন যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
ইউক্রেন এখন শুধু ড্রোন ব্যবহারই করছে না, বরং দ্রুতগতিতে নতুন প্রজন্মের মাঝারি-পাল্লার ড্রোন উৎপাদন করছে। এই ড্রোনগুলির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলি শনাক্ত করা কঠিন এবং দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে রাশিয়া-অধিকৃত অঞ্চলগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা। ক্রিমিয়া থেকে ডনবাস পর্যন্ত যে সড়কপথ সামরিক সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি এখন নিয়মিত হামলার মুখে।
ফলস্বরূপ জ্বালানি, অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক রসদ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ইউক্রেনীয় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বহু ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে পুড়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাঙ্কারের সারি।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ক্রিমিয়ার রুশপন্থী প্রশাসন পর্যন্ত জ্বালানি রেশনিং শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। সাধারণ মানুষকে কুপনের মাধ্যমে পেট্রোল সরবরাহের সিদ্ধান্ত যুদ্ধের বাস্তব চাপেরই প্রতিফলন।
যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি নাকি অচলাবস্থা?
পুতিনের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। তাঁর দাবি, রুশ বাহিনী প্রতিদিন এগিয়ে চলেছে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি এখন সময়ের অপেক্ষা।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র সেই দাবিকে সমর্থন করছে না।
পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে রাশিয়ার দৈনিক গড় অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কয়েক বছর ধরে বিপুল মানবসম্পদ ও অর্থ ব্যয়ের পরও বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য আসেনি।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম মালা টকমাচকার ঘটনা রাশিয়ার সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গের বিষয় হয়ে উঠেছে। মাসের পর মাস ধরে রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষ গ্রামটি দখলের দাবি করলেও বাস্তবে সেটি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে—যুদ্ধের লক্ষ্য আসলে কী? এবং সেই লক্ষ্য আদৌ অর্জনযোগ্য কি না?
ক্রেমলিনপন্থীদের মধ্যেও সন্দেহ
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সংশয় এখন শুধু বিরোধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
রুশ পররাষ্ট্রনীতি মহলের কিছু প্রভাবশালী কণ্ঠও বলতে শুরু করেছেন যে ইউক্রেনকে পুরোপুরি দখল করা বাস্তবসম্মত নয়। পশ্চিম ইউক্রেনসহ গোটা দেশ দীর্ঘমেয়াদে দখল করে রাখা রাশিয়ার পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
এমনকি আরও ভূখণ্ড দখল করলেও সেগুলি পরিচালনা করা কঠিন হবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি এবং শত্রুভাবাপন্ন জনগোষ্ঠী নিয়ে নতুন অঞ্চল শাসন করা রাশিয়ার জন্য নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই ধরনের মন্তব্য কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। কিন্তু এখন তা প্রকাশ্যে আসছে।
অভিজাত মহলে অসন্তোষ
রাশিয়ার ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরেও ফাটলের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। গত বছর মস্কোতে কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড রুশ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে।
পুতিনের ঘনিষ্ঠ মহলেও অনেকে নাকি হতাশ। একাংশ মনে করছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার যে আশা ছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে কট্টর যুদ্ধপন্থীরা অভিযোগ করছে, পুতিন যুদ্ধ জয়ের জন্য যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
অর্থাৎ তিনি এখন দুই দিক থেকেই চাপের মুখে—শান্তি চাওয়াদের কাছ থেকেও, যুদ্ধ জোরদার করতে চাওয়াদের কাছ থেকেও।
অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের ভার
যুদ্ধের শুরুতে সামরিক ব্যয় রাশিয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙ্গা করেছিল। অস্ত্র উৎপাদন বেড়েছিল, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই মডেলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ কমেছে। শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাজেট ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে।
সরকার ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ এখন আর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে না; বরং ধীরে ধীরে তার গতি শুষে নিচ্ছে।
তবুও কি পুতিনের পতন আসন্ন?
সব সংকট সত্ত্বেও অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়ায় তাৎক্ষণিক কোনো শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
কারণ পুতিন এখনও রাষ্ট্রযন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন। সাধারণ রুশ নাগরিকরাও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে সামাজিক চুক্তির ওপর পুতিনের শাসন দাঁড়িয়ে ছিল, অর্থাৎ “স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বিনিময়ে আনুগত্য”, সেটি এখন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এক নতুন অনিশ্চয়তার যুগ
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ পুতিনকে এমন এক অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে সহজে বেরিয়ে আসার পথ নেই। যুদ্ধ জেতা কঠিন, আবার যুদ্ধ ছেড়ে দেওয়াও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।
এই কারণেই আজকের রাশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ইউক্রেন নয়, বরং পুতিন নিজে।
তিনি কি এখনও সেই অদম্য শক্তিমান নেতা, যার ভাবমূর্তি দুই দশক ধরে রাশিয়াকে শাসন করেছে? নাকি ইউক্রেনের আকাশে উড়ে বেড়ানো ড্রোনগুলো শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক অজেয়তার মিথটিকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে?
সম্ভবত সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক বছরের রুশ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।