বাংলাস্ফিয়ার: ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী দিল্লি উৎসবে ফেটে পড়েছিল। একই ছবি দেখা গিয়েছিল দেশের অসংখ্য শহর ও জনপদে। সেদিনের প্রথম সরকারি অনুষ্ঠান ছিল লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেনের গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথগ্রহণ। আগের রাত পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয়। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শুধু রাজধানীতেই প্রায় ৩০০টি পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের খবর পাওয়া গিয়েছিল।

গণপরিষদে সেদিন বারবার উচ্চারিত হয় জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নাম। বাইরে জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় “মহাত্মা গান্ধী কি জয়”। কিন্তু যাঁকে নিয়ে এই উচ্ছ্বাস, তিনি নিজে ছিলেন না সেখানে। স্বাধীনতার এই দিনে রাজধানী থেকে দূরে থাকাই বেছে নিয়েছিলেন গান্ধী।

স্বাধীনতা ও আতঙ্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শহর

স্বাধীনতার দুই সপ্তাহ আগে দিল্লি ছেড়েছিলেন গান্ধী। কাশ্মীরে চারদিন কাটিয়ে ট্রেনে চেপে তিনি পৌঁছান কলকাতায়, যেখানে এক বছর আগে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে”-তে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক হিংসা তখনও থামেনি। বরং তা বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বিহার, যুক্তপ্রদেশ হয়ে শেষমেশ পাঞ্জাব পর্যন্ত।

লেখক ল্যারি কলিন্স ও দোমিনিক লাপিয়ের তাঁদের ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট (১৯৭৫) গ্রন্থে লিখেছেন, সেই সময় থেকে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডহীন একটি দিনও যায়নি কলকাতায়—ছুরি, পিস্তল আর লাঠি হাতে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আতঙ্ক গ্রাস করেছিল শহরটিকে।

১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতার বাইরে থেকে দেখা সমৃদ্ধির আবরণ শহরের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আড়াল করে রেখেছিল। ভারত যখন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন এই শহরের ৩০ লক্ষ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। কলিন্স ও লাপিয়েরের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের দৈনিক খাদ্য থেকে পাওয়া শক্তির পরিমাণ হিটলারের মৃত্যু-শিবিরে বন্দিদের বরাদ্দের চেয়েও কম ছিল।

এই কলকাতাতেই ১৩ আগস্ট বিকেল ৩টের কিছু পরে এসে পৌঁছন গান্ধী। তাঁর পুরনো শেভ্রোলে গাড়িটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বেলেঘাটা রোড দিয়ে এগিয়ে যায়। বেলেঘাটার হায়দরি হাউসে তিনি থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী গ্রন্থে লিখেছেন, “১৩ আগস্ট বিকেলে গান্ধী বেলেঘাটার মুসলমান-অধ্যুষিত এলাকায় বসবাস শুরু করেন। চারদিক থেকে জনতার প্রবেশের সুযোগ থাকা একটি ভাঙাচোরা বাড়িতে তিনি উঠেছিলেন। কলকাতার মতো প্রধান শহরে স্বাভাবিক বোধ ও শুভবুদ্ধি ফিরিয়ে আনার কাজে নিজের সামান্য অবদান রাখতে পারেন কি না, তা দেখাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।”

শীতল অভ্যর্থনা

কলকাতায় গান্ধীর অভ্যর্থনা অবশ্য মোটেই উষ্ণ ছিল না। তাঁর বাড়ির সামনে জড়ো হওয়া জনতার অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু। তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের সময় মুসলমান দাঙ্গাকারীদের হাতে আত্মীয়স্বজনকে হারিয়েছিলেন।

কলিন্স ও লাপিয়ের লিখেছেন, গান্ধীর গাড়িটি দেখা যেতেই জনতা তাঁর নাম ধরে চিৎকার শুরু করে। কিন্তু “তিন দশকের মধ্যে এই প্রথম” তারা গান্ধীর নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছিল না। বরং তাঁকে অভিশাপ দিচ্ছিল।

গান্ধী জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তিনি হিন্দু ও মুসলমান—উভয়েরই সেবা করতে কলকাতায় এসেছেন। তিনি নিজেকে তাদের হাতে সমর্পণ করছেন। কিন্তু মানুষ যদি আবার উন্মত্ত হয়ে ওঠে, তা হলে সেই উন্মত্ততার জীবিত সাক্ষী হয়ে তিনি থাকবেন না।

গান্ধীর কলকাতায় আসার অন্যতম কারণ ছিল নোয়াখালির মুসলমান নেতাদের দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি। তাঁরা কথা দিয়েছিলেন, ১৫ আগস্ট সেখানে একজন হিন্দুরও কোনও ক্ষতি হবে না। তাঁরা জানতেন, সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে গান্ধী আমরণ অনশনে বসবেন। কলকাতায় এসে গান্ধী একইভাবে শহরের মুসলমানদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব হিন্দুদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন।

উপবাস, প্রার্থনা আর চরকা—গান্ধীর তিন আহ্বান

১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় গান্ধীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, পরের দিনের স্বাধীনতা উদ্‌যাপন কীভাবে করা উচিত। রামচন্দ্র গুহর বিবরণ অনুযায়ী, গান্ধীর উত্তর ছিল কঠোর ও স্পষ্ট—“চারদিকে মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে। এই ধ্বংসের মধ্যে আপনারা কি উৎসব করতে চান?”

স্বাধীনতার প্রাক্কালে তাঁর মন কতটা বিষণ্ণ ছিল, তা আরও স্পষ্ট হয়েছিল হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে। স্বাধীনতা উপলক্ষে তাঁর কাছ থেকে একটি বার্তা চাওয়া হলে গান্ধী বলেছিলেন, তাঁর ভেতরটা “শুকিয়ে গিয়েছে”; তাঁর আর কিছু বলার নেই।

বিবিসি-ও গান্ধীর বক্তব্য রেকর্ড করতে তাঁর সচিবের সাহায্য চেয়েছিল। তাদের মতে, ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য গান্ধীর চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না। কিন্তু গান্ধী তাদের জওহরলাল নেহরুর কাছে যেতে বলেন।

সেই সন্ধ্যার প্রার্থনাসভায় গান্ধী স্বাধীনতার মুহূর্তের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যের কথা বলেছিলেন। যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সংগ্রাম করেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত এমন এক মূল্য দিয়ে এসেছিল, যা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। স্বাধীনতার সঙ্গেই এসেছিল দেশভাগ। তার আগে প্রায় এক বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে চলেছিল বিরামহীন সাম্প্রদায়িক হিংসা।

গান্ধী সতর্ক করে বলেছিলেন, স্বাধীনতা দেশের সামনে এক বিরাট দায়িত্বও এনে দেবে। কলকাতা যদি আবার শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের পথে ফিরতে পারে, তা হলে হয়তো ভারতের বাকি অংশকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই মানুষটিই অনুগামীদের জানিয়ে দিয়েছিলেন—স্বাধীনতার আগমন উদ্‌যাপনের উৎসবে তিনি যোগ দেবেন না। পরিবর্তে তিনি দেশবাসীকে তাঁর মতো করেই দিনটি পালন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন—উপবাস করে, ভারতের মুক্তি ও মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করে এবং চরকা কেটে।

গান্ধীর বিশ্বাস ছিল, সাধারণ মানুষের এই অতি পরিচিত, বিনম্র চরকাই বিপর্যয়ের কিনারা থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

স্বাধীনতার ভোর

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট গান্ধী ২৪ ঘণ্টার উপবাস পালন করেছিলেন। তবে স্বাধীনতার সেই সকালে কলকাতার রাস্তায় এমন কিছু দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, যা তাঁর মনে কিছুটা হলেও আশা জাগিয়েছিল।

হিন্দুরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিজয়তোরণ তৈরি করেছিলেন। জাতীয় পতাকা ও রঙিন কাপড়ে সাজানো হয়েছিল রাস্তা। একই সঙ্গে মুসলমান দোকানদার ও গৃহস্থেরাও নিজেদের দোকান ও বাড়িতে নতুন ভারতীয় অধিরাজ্যের পতাকা তুলেছিলেন।

হিন্দু ও মুসলমানরা একই সঙ্গে গাড়িতে চড়ে কলকাতার রাস্তায় ঘুরছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে “জয় হিন্দ” ধ্বনি দিচ্ছিলেন। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই সেই আহ্বানে উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দিয়েছিলেন।

রামচন্দ্র গুহ লিখেছেন, “হিন্দু ও মুসলমানদের এই স্বতঃস্ফূর্ত মেলামেশার খবর মহাত্মার মনকে কিছুটা হলেও প্রফুল্ল করে তুলেছিল।”

গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন, সন্ধ্যার প্রার্থনাসভায় তিনি এই পরিবর্তনের কথা বলবেন। তাঁর বক্তব্য শুনতে বেলেঘাটার রাশবাগান ময়দানে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।

গান্ধী বলেন, তিনি বিশ্বাস করতে চান, হিন্দু-মুসলিমের এই সৌহার্দ্য এসেছে হৃদয়ের গভীর থেকে, কোনও ক্ষণিকের আবেগ থেকে নয়। তাঁর ভাষায়, দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ইতিমধ্যে “হিংসা ও অশান্তির বিষপাত্র” থেকে পান করেছেন; এখন যখন মিলন ঘটেছে, হয়তো “সৌহার্দ্যের অমৃত” আরও  বেশি মধুর বলে মনে হবে।