হাইলাইটস:
- দ্বিতীয় ‘জনতা দরবারে’ স্বাস্থ্য, চাকরির নিরাপত্তা ও বিচার চেয়ে হাজির শতাধিক মানুষ
- মিশন বাৎসল্যের কর্মীরা স্থায়ী চাকরির দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ
- মৃত সন্তানদের জন্য ন্যায়বিচার চাইলেন দুই মা
- অভিযোগ, আগের সরকার খুন ও অপরাধের ঘটনা চাপা দিয়েছিল
- মেসি-কাণ্ডে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে তৃতীয়বার তলব পুলিশের
- দুর্গাপুজোর ভিআইপি টিকিট কেলেঙ্কারিতে আগাম জামিন চাইলেন ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রী
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতা দরবার’ ধীরে ধীরে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনসংযোগ কর্মসূচিতে পরিণত হচ্ছে। শনিবার বিজেপির রাজ্য কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জনতা দরবারে মানুষের ভিড়ই তার প্রমাণ। স্বাস্থ্য সমস্যা, চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক অবিচার, রহস্যমৃত্যুর তদন্ত— নানান অভিযোগ ও আবেদন নিয়ে সাধারণ মানুষ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সামনে হাজির হন।
মুখ্যমন্ত্রী প্রতিটি অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে স্বাস্থ্য ও চাকরি সংক্রান্ত অভিযোগ। বহু পরিবার গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। করুণা নামে এক মহিলা তাঁর মেয়ের চিকিৎসার খরচ বহনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান।
চাকরির নিরাপত্তার দাবিও ছিল জোরালো। রাজ্য সরকারের ‘মিশন বাত্সল্য’ প্রকল্পের কর্মী তনিমা চট্টোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জানান, রাজ্যে এই প্রকল্পে ৮৭৬ জন কর্মী কাজ করলেও তাঁদের কোনও স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা নেই। তাঁরা কেবল নির্দিষ্ট ভাতা পান।
তনিমার বক্তব্য, “আমরা কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করি। অথচ আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত। আগের সরকার আমাদের জন্য কিছুই করেনি। নতুন সরকার অন্তত আমাদের চাকরি স্থায়ী করবে বলে আশা করছি।”
জনতা দরবারে আবেগঘন মুহূর্তও তৈরি হয়। দুই মা তাঁদের সন্তানদের মৃত্যুর বিচার চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে হাজির হন।
একজন ছিলেন আট বছরের আয়ুষ কুমারনাথের মা। অভিযোগ, বাঁশদ্রোণীর একটি স্কুলে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় শিশুটির। অন্যজন ছিলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক ছাত্রের মা। ২০২৪ সালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছিল, যা আর জি কর কাণ্ডেরও আগে ঘটেছিল।
এ ছাড়া আরও অনেকে অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে খুন ও গুরুতর অপরাধের একাধিক ঘটনা প্রশাসন ও পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়েছিল। তাঁদের দাবি, নতুন সরকার যেন সেই সব মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে।
বিজেপি পরে এক বিবৃতিতে জানায়, “মানুষের সমস্যা, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং অভিযোগই আজকের কর্মসূচির কেন্দ্রে ছিল। মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যেকের কথা শুনেছেন এবং দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন।”
দলের বক্তব্য, “প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, তাঁদের সমস্যা বোঝা এবং তার সমাধান করার মধ্যেই নিহিত।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘জনতা দরবার’ বহুদিন ধরেই জনপ্রিয় প্রশাসনিক মডেল। পশ্চিমবঙ্গেও সেই পথেই হাঁটছে নতুন সরকার। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সরাসরি জনসংযোগ বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনের জবাবদিহিও বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে শনিবারই নতুন মন্ত্রীদের জন্য নেতাজি সুভাষ প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ মন্ত্রীই প্রথমবার প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন, বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ এবং অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত-সহ একাধিক মন্ত্রী অংশ নেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার তিন দিন পর শনিবার বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ তাঁকে তৃতীয়বার সমন পাঠায়।
পুলিশের নির্দেশ, সমন পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে থানায় হাজিরা দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ, তিনি এখনও অধরা এবং আগের সমনগুলিরও কোনও জবাব দেননি।
২০২৫ সালের বহুচর্চিত ‘মেসি ইভেন্ট’ বিশৃঙ্খলা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে টিকিট কালোবাজারি, তোলাবাজি, ভয় দেখানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতি এবং প্রতারণা।
শতদ্রুর দাবি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অব্যবস্থাপনার কারণে লিওনেল মেসি মাঠে মাত্র ১৫-২০ মিনিট ছিলেন। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ব্যাপক ভাঙচুর হয়।
১০ জুন হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল, অরূপ বিশ্বাসকে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। তবে আদালতের অনুমতি ছাড়া ১৭ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। ফলে তিনি হাজিরা দিলেও গ্রেফতারের আশঙ্কা আপাতত নেই।
একই সঙ্গে আরেকটি মামলায় নতুন মোড় এসেছে। প্রাক্তন পর্যটন ও তথ্য-সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর স্ত্রী মধুচন্দা সেন শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন।
দুর্গাপুজোর ভিআইপি ‘ডোনার পাস’ ও ‘প্রিভিউ শো’ টিকিট বিক্রিকে কেন্দ্র করে এই মামলা দায়ের হয়েছে। অভিযোগ, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে বিশেষ দর্শনের নামে উচ্চমূল্যে টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ পরামর্শদাতা জয়দীপ মুখোপাধ্যায় এবং সাগুনা মুখোপাধ্যায় এই অভিযোগ দায়ের করেন।
পুলিশ ইতিমধ্যে প্রতারণা, জালিয়াতি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে। আগামী ১৭ জুন মামলাটির শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে শনিবারের দিনটি ছিল একদিকে জনতার দরবারে মানুষের প্রত্যাশা ও অভিযোগের দিন, অন্যদিকে প্রাক্তন শাসক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা তদন্তের ক্ষেত্রেও ঘটনাবহুল। নতুন সরকার প্রশাসনিক সংযোগ ও জবাবদিহির বার্তা দিতে চাইছে, আর বিরোধী শিবিরের একাংশ ক্রমশ আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে— এই দুই ছবিই দিনের শেষে সমানভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল।