মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসে ফেরার আহ্বান জানালেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর নেতৃত্ব মেনে কাজ করতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তবে আমন্ত্রণের সঙ্গে জুড়েছেন শর্ত: সঙ্গে আনা যাবে না বাড়তি ‘বোঝা’। বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর বহরমপুরে সাংবাদিকদের কাছে অধীরের এই মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন নির্বাচনী পরাজয় ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে মমতার নেতৃত্বাধীন শিবির গভীর সঙ্কটে।

অধীরের বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচনে হারের পরে তৃণমূলের পৃথক রাজনৈতিক সত্তা বজায় রাখার প্রয়োজন কমে গিয়েছে। মমতার সঙ্গে থাকা সাংসদ ও বিধায়কদেরও কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে মমতার উপস্থিতি এবং সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ কথাবার্তার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই এই প্রস্তাব সামনে আসে। মমতা ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গড়েছিলেন। সেই বিচ্ছেদের আটাশ বছর পরে তাঁকে পুরনো দলে ফেরানোর কথা বলছেন এমন এক নেতা, যিনি বাংলায় তাঁর অন্যতম ধারাবাহিক সমালোচক হিসেবে পরিচিত।

তবে অধীরের আহ্বানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ তাঁর শর্ত। কাউকে সরাসরি চিহ্নিত না করেই তিনি মমতাকে সমস্যার কারণ হয়ে ওঠা ব্যক্তিকে পিছনে রেখে আসতে বলেছেন। নিশানা মমতার ভাইপো তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনী বিপর্যয়ের দায় অভিষেকের উপর চাপিয়েছেন দলের বিদ্রোহীদের অনেকে। যদিও অধীর নিজে তাঁর নাম উচ্চারণ করেননি।

মমতার প্রত্যাবর্তনের পক্ষে কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছেও আবেদন জানাবেন বলে জানিয়েছেন অধীর। পাশাপাশি তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার মতো রেজিনগরেও একই অবস্থান নিন মমতা। আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের আগে এই আবেদন কংগ্রেসের পক্ষে সমর্থন সংহত করার চেষ্টাও বটে। ফলে অধীরের বক্তব্যে দলীয় পুনর্মিলনের প্রস্তাবের সঙ্গে তাৎক্ষণিক নির্বাচনী প্রত্যাশাও স্পষ্ট।

তৃণমূলের তরফে সৌগত রায় অবশ্য অধীরের বক্তব্যকে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর বক্তব্য, অধীর নিজের মত জানিয়েছেন; কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে দল আলোচনা করবে। তৃণমূল এখনও পৃথক রাজনৈতিক দল এবং ইন্ডিয়া জোটের শরিক বলেও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন। অভিষেককে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিতের জবাবে সৌগত জানিয়েছেন, তাঁকে ছাড়া দলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না; তিনি দলের নেতা এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক।

এই বিতর্কের পিছনে রয়েছে বাংলায় কংগ্রেস ও মমতার দীর্ঘ টানাপড়েন। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই সময়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, নন্দীগ্রামে মমতার সমর্থন সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে প্রদেশ কংগ্রেসের একাংশের প্রবল আপত্তি রয়েছে। অধীরও সেই আপত্তিকারীদের মধ্যে ছিলেন। তৃণমূলের শাসনকালে দল ভাঙানো এবং কংগ্রেস কর্মীদের উপর আক্রমণের অভিযোগকে তাঁরা আপত্তির কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কংগ্রেস নেতা গোলাম আহমেদ মীরও নন্দীগ্রামের সমর্থনকে পরিস্থিতিনির্ভর বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ, একটি কেন্দ্রে সমর্থনের সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর জোটের সমার্থক হিসেবে দেখছিলেন না তাঁরা।

সেই পটভূমিতে অধীরের নতুন মন্তব্যকে নিঃশর্ত সমঝোতার ঘোষণা বলা কঠিন। তাঁর প্রস্তাবের রাজনৈতিক অর্থ, মমতা নেতৃত্ব দিতে পারেন, কিন্তু সেই নেতৃত্বের সাংগঠনিক ঠিকানা হবে কংগ্রেস। পৃথক দল হিসেবে তৃণমূলের সঙ্গে আসন সমঝোতা এবং মমতার কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন যে ভিন্ন বিষয়, বক্তব্যে সেই ফারাকই সামনে এসেছে। আবার অভিষেককে ঘিরে শর্ত তোলায় সম্ভাব্য আলোচনার গোড়াতেই একটি বড় মতবিরোধও দৃশ্যমান হয়েছে।

আপাতত তাই কোনও দলীয় সংযুক্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন তথ্য নেই। অধীরের আমন্ত্রণ, হাইকমান্ডের কাছে তাঁর আবেদন জানানোর কথা এবং সৌগতের শর্তসাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া—এই তিনটির মধ্যেই খবরটি সীমাবদ্ধ। জাতীয় স্তরে একই বিরোধী মঞ্চে উপস্থিতি বাংলায় পুরনো বিরোধ মিটিয়ে দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। বরং ঘটনাটি দেখাচ্ছে, বিজেপির বিরোধিতায় সহযোগিতার পাশাপাশি রাজ্যে নেতৃত্ব, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নগুলি এখনও অমীমাংসিত।