বাংলাস্ফিয়ার: নরওয়ের রাজপরিবারের সদস্যদের কথা উঠলে সাধারণত আলোচনায় আসেন রাজা, যুবরাজ বা যুবরানী। কিন্তু গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলির একটি হল মারিয়ুস বর্গ হোইবি।

অদ্ভুত এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন মারিয়ুস। তিনি রাজপরিবারের অন্দরমহলের মানুষ, কিন্তু রাজপরিবারের সদস্য নন। তিনি রাজপ্রাসাদে বড় হয়েছেন, কিন্তু সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নন। তিনি রাজকীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন, কিন্তু কখনও কোনও সাংবিধানিক ভূমিকা পাননি।

আর সেই কারণেই তাঁর জীবন যেন আধুনিক ইউরোপীয় রাজতন্ত্রের এক ব্যতিক্রমী উপাখ্যান।

রাজকীয় রূপকথার বাইরের সন্তান

মারিয়ুসের জন্ম ১৯৯৭ সালে।

তাঁর মা মেটে-মারিত তখনও নরওয়ের রাজপরিবারের অংশ নন। মারিয়ুসের বাবা ছিলেন মোর্তেন বর্গ, যাঁর সঙ্গে মেটে-মারিতের সম্পর্ক পরে ভেঙে যায়।

২০০১ সালে মেটে-মারিত যখন নরওয়ের যুবরাজ ক্রাউন প্রিন্স হাকন -কে বিয়ে করেন, তখন মাত্র চার বছরের মারিয়ুস এক লাফে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত রাজপরিবারের অন্দরমহলে প্রবেশ করেন।

সেই সময় নরওয়েতে মেটে-মারিতের বিয়ে নিয়েও বিতর্ক ছিল। তিনি ছিলেন একক মা। তাঁর অতীত জীবন নিয়েও সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা চলেছিল। ফলে মারিয়ুসের শৈশব শুরু থেকেই জনদৃষ্টির কেন্দ্রে।

রাজপ্রাসাদে বড় হওয়া

মারিয়ুসের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।

তিনি একই বাড়িতে বড় হয়েছেন তাঁর সৎ ভাই ও বোনের সঙ্গে—নরওয়ের রাজকুমারী ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এবং প্রিন্স সার্ভেরে ম্যাগনাস।

ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা ভবিষ্যতে নরওয়ের রানি হবেন।

সার্ভেরে ম্যাগনুস রাজপরিবারের সদস্য। কিন্তু মারিয়ুস নন। তিনি রাজকীয় উপাধি পাননি। সরকারি অর্থে পরিচালিত রাজকীয় দায়িত্বও তাঁর ছিল না। অর্থাৎ তিনি রাজপরিবারের ভেতরে থেকেও এক অর্থে বাইরের মানুষ।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই পরিচয়গত দ্বন্দ্ব তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

জনজীবন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা

কৈশোরে নরওয়ের রাজপরিবার সচেতনভাবেই মারিয়ুসকে জনজীবনের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।

তাঁকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তিনি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।

পরে ব্যবসা, ফ্যাশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকেন।

কিছু সময়ের জন্য তিনি মডেলিং ও বিলাসবহুল ব্র্যান্ড-সংক্রান্ত কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু এই সময় থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।

খ্যাতির বোঝা

মারিয়ুসের সমস্যা ছিল, তিনি এমন এক পরিচয়ের মালিক যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

তিনি আনুষ্ঠানিক রাজপুত্র নন।

তবু সবাই তাঁকে রাজপরিবারের সদস্য হিসেবেই দেখত।

তিনি সাধারণ নাগরিক হতে চাইলেও সংবাদমাধ্যম তাঁকে সাধারণ নাগরিক হিসেবে দেখেনি।

তিনি ব্যবসায়ী হতে চাইলেও তাঁকে “ক্রাউন প্রিন্সেসের ছেলে” হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই অবস্থাকে অনেকেই “রাজকীয় ছায়ার অভিশাপ” বলে বর্ণনা করেন।

বিতর্কের শুরু

বিশের কোঠায় পৌঁছনোর পর মারিয়ুসের জীবন নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে।

রাতের পার্টি, মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ, উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং নানা ব্যক্তিগত ঘটনা বারবার শিরোনামে আসে।

নরওয়ের গণমাধ্যম দীর্ঘদিন তাঁকে নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিলেও পরে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাজপরিবারের সবচেয়ে বড় জনসংযোগ-সমস্যাগুলির একটি হয়ে উঠছেন মারিয়ুস।

রাজতন্ত্রের জন্য অস্বস্তি

নরওয়ে ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজতন্ত্রগুলির একটি।

রাজপরিবার সাধারণত সংযত, কম বিতর্কিত এবং জনমুখী হিসেবে পরিচিত।

সেই প্রেক্ষাপটে মারিয়ুসের ব্যক্তিগত জীবন বারবার সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা প্রাসাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

কারণ তিনি আনুষ্ঠানিক সদস্য না হলেও জনগণের চোখে তিনি রাজপরিবারেরই প্রতিনিধি।

আদালতের রায় ও নতুন বাস্তবতা

ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর মারিয়ুসের জীবন সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে।

এক সময় তাঁকে নিয়ে আলোচনা হতো তিনি কী পোশাক পরছেন, কোথায় যাচ্ছেন বা কার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

আজ তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে অপরাধ, বিচার এবং জবাবদিহির প্রসঙ্গে।

এই রায় নরওয়ের রাজপরিবারকেও অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

যদিও তিনি রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক সদস্য নন, তবু তাঁর পরিচয় কখনও সেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না।

এক ট্র্যাজিক চরিত্র?

মারিয়ুস বর্গ হোইবির জীবনকে কেউ কেউ আধুনিক রাজতন্ত্রের ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন।

তিনি এমন এক জগতে জন্মেছিলেন যার দরজা অধিকাংশ মানুষের জন্য বন্ধ।

কিন্তু সেই জগতের পূর্ণ সদস্যও কখনও হতে পারেননি।

তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন।

আবার বিশেষ নজরদারির শিকারও হয়েছেন।

তিনি রাজপরিবারের অংশ ছিলেন।

আবার ছিলেন না।

এই দ্বৈত পরিচয় তাঁর জীবনকে সবসময় জটিল করে রেখেছে।

তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মানুষকে তার পরিচয়ের জন্য নয়, তার কাজের জন্য বিচার করে।

আর সেই কারণেই মারিয়ুস বর্গ হোইবির নাম আজ নরওয়ের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে কোনও রূপকথার চরিত্র হিসেবে নয়, বরং এক গভীর বিতর্ক, পতন এবং জবাবদিহির অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে।