দিল্লির রাউজ অ্যাভিনিউ আদালত প্রাক্তন ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের (ডব্লিউএফআই) সভাপতি ও বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ সিংকে যৌন হেনস্তার মামলায় খালাস দেওয়ার পর নতুন করে রাজনৈতিক ও ক্রীড়া মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দোলনের অন্যতম মুখ ভিনেশ ফোগাট। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই লড়াই কেবল ব্যক্তিগত ন্যায়বিচারের জন্য নয়, দেশের সমস্ত মহিলা ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট (এসিজেএম) অশ্বিনী পানওয়ারের আদালত সোমবার ব্রিজভূষণ শরণ সিং এবং সহ-অভিযুক্ত বিনোদ তোমার—উভয়কেই খালাস দেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলায় অভিযোগকারী মহিলা কুস্তিগীর, প্রসিকিউশন এবং অভিযুক্তদের যুক্তি শোনার পর আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। বিচারপ্রক্রিয়া ‘ইন-ক্যামেরা’ বা গোপনীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এই মামলায় মহিলা কুস্তিগীরদের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী রেবেকা জন। ব্রিজভূষণের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী রাজীব মোহন। ২০২৪ সালের মে মাসে ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। যদিও অভিযোগকারী এক মহিলার ক্ষেত্রে তাঁকে আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়। সহ-অভিযুক্ত বিনোদ তোমারের বিরুদ্ধে কেবল এক অভিযোগকারীর ক্ষেত্রে ফৌজদারি ভয় দেখানোর অভিযোগে চার্জ গঠন হয়েছিল।
রায় ঘোষণার পরই ভিনেশ ফোগাট সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করব। আমরা এখনও বিচার পাইনি। সত্যের লড়াই চলবে।” তাঁর বক্তব্য, আদালতের এই রায় আন্দোলনের সমাপ্তি নয়; বরং আইনি লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ভিনেশের এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্য কুস্তিগীররাও। তাঁদের মতে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে যে আন্দোলন চলেছে, তা কোনও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়; বরং খেলাধুলার পরিবেশকে নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করার দাবিতে। ফলে নিম্ন আদালতের রায়ে হতাশ হলেও তাঁরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
এই মামলাটি দেশের অন্যতম আলোচিত যৌন হেনস্তার অভিযোগে পরিণত হয়েছিল। ২০২৩ সালে অলিম্পিক ও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ী একাধিক মহিলা কুস্তিগীর প্রকাশ্যে অভিযোগ আনেন যে, ব্রিজভূষণ শরণ সিং দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের যৌন হেনস্তা করেছেন। প্রথমে অভিযোগ নথিভুক্ত করতে দেরি হওয়ায় তাঁরা দিল্লির যন্তর মন্তরে দীর্ঘ আন্দোলন শুরু করেন। সেই আন্দোলনে অংশ নেন ভিনেশ ফোগাট, সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া-সহ বহু আন্তর্জাতিক পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ।
জনমত এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পর দিল্লি পুলিশ ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে এবং তদন্ত শুরু হয়। পরে আদালতে চার্জশিট জমা পড়ে। সেই মামলারই পরিণতি হল সোমবারের খালাসের রায়।
আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ঠিক কোন আইনি ভিত্তিতে ব্রিজভূষণকে খালাস দেওয়া হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে জানা যায়নি। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের আপিল করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। হাইকোর্ট যদি মনে করে যে প্রমাণের মূল্যায়নে ত্রুটি হয়েছে বা আইনের ব্যাখ্যায় ভুল হয়েছে, তবে মামলাটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
এই মামলার গুরুত্ব শুধু একটি ফৌজদারি বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনে যৌন হেনস্তার অভিযোগ, অভিযোগকারীদের সুরক্ষা এবং ক্রীড়া সংস্থাগুলির জবাবদিহি নিয়ে যে জাতীয় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঘটনাই। ফলে আদালতের রায়ের পরও সেই বিতর্ক শেষ হচ্ছে না।
ভিনেশ ফোগাটের আপিলের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, আইনি লড়াই এখন উচ্চ আদালতে গড়াবে। ফলে ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক অধ্যায় এখনও শেষ হয়নি। দিল্লি হাইকোর্টে এই মামলার ভবিষ্যৎ শুনানি শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির জন্যই নয়, দেশের ক্রীড়া জগতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।