হাইলাইটস:
- ২০১২ সালের ওবিসি সংরক্ষণ আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।
- ১৭ শতাংশের বদলে ৭ শতাংশ সংরক্ষণের কাঠামোকে আইনি স্বীকৃতি।
- ২০১০-পরবর্তী ওবিসি-বি তালিকার ৭৭/৭৮টি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি বাতিলের পথ প্রশস্ত।
- ভবিষ্যতে কমিশনের সুপারিশ ছাড়া কোনও সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া যাবে না।
- কলকাতা হাইকোর্টের ২০২৪ সালের রায়ের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হল।
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সোমবার ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। এই দুটি বিলের মাধ্যমে রাজ্যের ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, কলকাতা হাইকোর্টের ২০২৪ সালের রায় কার্যকর করা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে আরও শক্তিশালী করাই এই সংশোধনের উদ্দেশ্য।
প্রথম বিলটি হল পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি (তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি ব্যতীত) সরকারি চাকরি ও পদে সংরক্ষণ (সংশোধনী) বিল, ২০২৬। দ্বিতীয়টি হল পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬। দুটি বিলই ধ্বনিভোটে পাস হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে সংরক্ষণের কাঠামোয়। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ওবিসি-এ ও ওবিসি-বি মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে মোট ১৭ শতাংশ সংরক্ষণ চালু ছিল। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট ২০২৪ সালে ২০১০ সালের পর ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বহু সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি বাতিল করে। সেই রায়ের পর নতুন সরকার প্রশাসনিকভাবে সংরক্ষণ ৭ শতাংশে নামিয়ে আনে। এবার সেই ব্যবস্থাকেই আইনের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে ৬৬টি স্বীকৃত ওবিসি সম্প্রদায়ের জন্য ৭ শতাংশ সংরক্ষণই বহাল থাকবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তৈরি ওবিসি-বি তালিকার তফসিল আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকাতেই ২০১০ সালের পর অন্তর্ভুক্ত ৭৭ বা ৭৮টি সম্প্রদায় ছিল, যাদের স্বীকৃতি কলকাতা হাইকোর্ট বাতিল করেছিল। নতুন সংশোধনের ফলে সেই তালিকার আর কোনও আইনি অস্তিত্ব রইল না।
কমিশনের ভূমিকাও অনেক বেশি শক্তিশালী করা হয়েছে। আগে সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে নতুন সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করত। এখন থেকে তা আর সম্ভব হবে না। কোনও সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা, বাদ দেওয়া বা শ্রেণিবিন্যাসে পরিবর্তন আনার আগে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের বিস্তারিত সমীক্ষা ও সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ কমিশনের মতামতই হবে সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
সংশোধনী আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি, সংগঠন বা সম্প্রদায় যদি মনে করে কোনও গোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়া উচিত, তাহলে তারা কমিশনের কাছে আবেদন বা আপত্তি জানাতে পারবে। কমিশন তথ্য সংগ্রহ, সমীক্ষা ও শুনানির মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করে সরকারকে সুপারিশ করবে। এর ফলে ওবিসি তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও নথিভিত্তিক হবে বলে সরকারের দাবি।
সরকারের বক্তব্য, এই সংশোধনের মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে তথ্য, সমীক্ষা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনও সম্প্রদায়ের সামাজিক ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া ওবিসি মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এই পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে সংরক্ষণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আদালতে টিকে থাকার সম্ভাবনাও বাড়বে বলে সরকারের দাবি।
বিরোধীদের অভিযোগ অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এই সংশোধনের ফলে বহু সম্প্রদায় সংরক্ষণের সুযোগ হারাবে এবং সামাজিক ন্যায়ের পরিধি সংকুচিত হবে। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি, আদালতের নির্দেশ মেনেই আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত অনগ্রসর সম্প্রদায়গুলিকে কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই সংরক্ষণের আওতায় আনা হবে।
সব মিলিয়ে, এই দুই সংশোধনী বিলের মূল তাৎপর্য তিনটি—প্রথমত, ওবিসি সংরক্ষণকে ৭ শতাংশের বর্তমান কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা; দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টে বাতিল হওয়া পুরনো তালিকাকে আইন থেকে সরিয়ে দেওয়া; এবং তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে ওবিসি তালিকা নির্ধারণে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের ভূমিকাকে বাধ্যতামূলক ও আরও শক্তিশালী করা। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণের আইনি কাঠামো একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল।