হাইলাইটস:

  • বিধানসভায় পাশ হল পশ্চিমবঙ্গের নতুন গুন্ডাদমন আইন
  • বিচার ছাড়াই এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার বিধান ঘিরে তীব্র বিতর্ক
  • ‘সমাজবিরোধী’র বিস্তৃত সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন আইন বিশেষজ্ঞদের
  • জেলা থেকে নির্বাসন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও পুলিশের বাড়তি ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
  • সরকারের দাবি, সংগঠিত অপরাধ দমনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ; বিরোধীদের অভিযোগ, অপব্যবহারের আশঙ্কা

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়েছে বহুল আলোচিত ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’, যা ইতিমধ্যেই ‘গুন্ডাদমন আইন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সরকারের দাবি, তোলাবাজি, জমি দখল, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই এই আইন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আইনটি পাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে জোরালো বিতর্ক। বিরোধী দল, আইনজীবীদের একাংশ এবং নাগরিক অধিকার কর্মীদের মতে, আইনের একাধিক ধারা মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে।

সবচেয়ে বেশি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রতিরোধমূলক আটক বা Preventive Detention-এর বিধান। আইন অনুযায়ী, প্রশাসনের কাছে যদি মনে হয় কোনও ব্যক্তি ভবিষ্যতে জনশৃঙ্খলার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, তবে তাঁকে বিচার সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই দীর্ঘ সময়ের জন্য আটক রাখা সম্ভব। সরকারের বক্তব্য, সংগঠিত অপরাধ দমনে এই ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, কোনও অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগেই একজন নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া কি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী নয়? তাঁদের মতে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হল—অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত নির্দোষ।

আইনের আর একটি বড় বিতর্কিত দিক হল ‘সমাজবিরোধী’ বা ‘গুন্ডা’ শব্দের বিস্তৃত সংজ্ঞা। শুধু খুন, ডাকাতি বা সংঘবদ্ধ অপরাধ নয়, অভ্যাসগত তোলাবাজি, ভয় দেখানো, জমি দখল কিংবা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হওয়া ব্যক্তিদেরও এই আইনের আওতায় আনা যেতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংজ্ঞা যত বিস্তৃত হবে, প্রশাসনের ব্যাখ্যার সুযোগও তত বাড়বে। আর সেই কারণেই আইনটির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

নতুন আইনে রয়েছে নির্দিষ্ট এলাকা বা জেলা থেকে কোনও ব্যক্তিকে নির্বাসিত করার ক্ষমতাও। অর্থাৎ প্রশাসন মনে করলে কোনও ব্যক্তিকে এক বা একাধিক জেলা ছেড়ে চলে যেতে বলা হতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেখানে ফিরে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে। সমালোচকদের বক্তব্য, আদালতের রায় ছাড়াই কোনও নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার সীমিত করা সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলতে বাধ্য।

আইনের আর একটি উল্লেখযোগ্য ধারা হল অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত বলে সন্দেহভাজন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা। সরকারের মতে, সংগঠিত অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে দিতে এই ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু আইনজীবীদের একাংশের প্রশ্ন, বিচার শেষ হওয়ার আগেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হলে পরে অভিযুক্ত নির্দোষ প্রমাণিত হলে সেই ক্ষতির প্রতিকার কীভাবে হবে?

নতুন আইনে পুলিশের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তল্লাশি, গ্রেপ্তার, সম্পত্তি জব্দ এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের হাতে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত বিচারিক নজরদারি না থাকলে এই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতেই পারে।

এ ছাড়া আইনের আওতায় থাকা বহু অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা হয়েছে। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হতে পারে, এমনকি বিচার শুরু হওয়ার আগেই। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এতে বাস্তবে ‘বিচারের আগে শাস্তি’ পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিতর্ক তৈরি হয়েছে আরও একটি বিধানকে ঘিরে। আইনে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিই নন, তাঁকে আশ্রয় দেওয়া, লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করা কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রাও আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

তবে আইনটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক অন্য জায়গায়। বিরোধীদের অভিযোগ, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মী, আন্দোলনকারী বা সরকারবিরোধী কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধেও এই আইন ব্যবহার করা হতে পারে। কারণ, ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর ব্যাখ্যা অনেকটাই প্রশাসনের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল। যদিও সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, এই আইন শুধুমাত্র সংঘবদ্ধ অপরাধী, তোলাবাজ ও সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নতুন আইনের কয়েকটি ধারা ভারতের সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ এবং ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, অবাধ চলাফেরা এবং গ্রেপ্তার-আটক সংক্রান্ত সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়গুলি ভবিষ্যতের বিচারিক পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকার অবশ্য এই সমস্ত সমালোচনা খারিজ করেছে। তাদের দাবি, বিদ্যমান আইন দিয়ে সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, জমি দখল এবং অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই দেশের অন্য কয়েকটি রাজ্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এই নতুন আইন আনা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য।

তবে আইনটি নিয়ে বিতর্ক যে এখানেই শেষ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট। ভারতে অতীতেও বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের কঠোর জননিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়েছে। কোথাও তা অপরাধ দমনে সাফল্য এনেছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক ব্যবহার ও সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন গুন্ডাদমন আইনও এখন সেই একই পরীক্ষার সামনে। আইনটি বাস্তবে অপরাধ দমনের কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠবে, নাকি নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত করবে—তার উত্তর দেবে আগামী দিনের প্রয়োগ এবং আদালতের রায়।