-
হাইলাইটস:
- প্রথমবার নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে জরুরি অবস্থার পৃথক অধ্যায় সংযোজন করল এনসিইআরটি।
- ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থাকে ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
- মৌলিক অধিকার স্থগিত, সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপ ও বিরোধী নেতাদের গ্রেফতারের উল্লেখ রয়েছে পাঠ্যবইয়ে।
- জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের ভূমিকাও স্থান পেয়েছে নতুন অধ্যায়ে।
- বর্তমান সময়ের ভুয়ো তথ্য, সামাজিক বৈষম্য ও লিঙ্গবৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জের সঙ্গেও গণতন্ত্রের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ভারতের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়গুলির একটি—১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা—এবার স্থান পেল নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে। প্রথমবারের মতো জাতীয় শিক্ষাক্রমে এই বিষয়টিকে আলাদা করে অন্তর্ভুক্ত করেছে জাতীয় শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পরিষদ (এনসিইআরটি)। নতুন পাঠ্যবই ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এ জরুরি অবস্থাকে ভারতের গণতন্ত্রের সামনে এক ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এ বছর জরুরি অবস্থার ঘোষণার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই সংযোজনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের উদ্দেশ্য কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে তুলে ধরা নয়, বরং গণতন্ত্র কীভাবে সংকটে পড়তে পারে এবং নাগরিকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সেই শিক্ষাও দেওয়া।
বইটিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের আগে দেশে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ দ্রুত বাড়ছিল। বিশেষ করে বিহার ও গুজরাতে ছাত্র-যুব আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করে। এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
নতুন অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, জরুরি অবস্থার সময় নাগরিকদের একাধিক মৌলিক অধিকার কার্যত স্থগিত হয়ে যায়। সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। বিরোধী দলের বহু নেতা, সমাজকর্মী ও আন্দোলনকারীদের বিচার ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত হয় এবং সরকারের সমালোচনার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
পাঠ্যবইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনকে। ছাত্র-যুব সমাজ ও সাধারণ মানুষকে একত্রিত করে গণতন্ত্র রক্ষার যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিহার ও গুজরাতের আন্দোলনের উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে, গণতন্ত্রে জনগণের অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এনসিইআরটির নতুন বই শুধুমাত্র অতীতের ঘটনাবলিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গণতন্ত্রের সামনে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলিও আলোচনায় এসেছে। ভুয়ো তথ্যের বিস্তার, সামাজিক বৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং নাগরিক সচেতনতার অভাব—এসবকেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমানাধিকার, সহনশীলতা এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের ওপরও নির্ভরশীল।
শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনৈতিক যাত্রাপথে জরুরি অবস্থা এমন একটি সময়, যখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক স্বাধীনতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছিল। ফলে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ বোঝাতে এই অধ্যায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন নয়। জরুরি অবস্থাকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন। কেউ এটিকে গণতন্ত্রের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় বলে মনে করেন, আবার কেউ সেই সময়কার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেন। ফলে পাঠ্যক্রমে এই বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শিক্ষাবিদদের মতে, ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলি এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ও প্রামাণ্যভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা উচিত। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
জরুরি অবস্থা শেষ হয় ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে। এরপর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার পরাজিত হয় এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই নির্বাচনকে ভারতের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণের রায়ের শক্তির এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নতুন পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে এনসিইআরটি মূলত সেই বার্তাই তুলে ধরতে চেয়েছে—গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের বিধান নয়, বরং নাগরিকদের সচেতনতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষার ধারাবাহিক অনুশীলনের নাম। অতীতের ভুল ও সংকট সম্পর্কে জানলেই ভবিষ্যতের নাগরিকরা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।