Table of Contents
হাইলাইটস:
- ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, রবিবারই ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সই হবে।
- চুক্তি কার্যকর হলে খুলে যেতে পারে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী।
- পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
- ইরান বলছে, আলোচনা অনেক দূর এগোলেও এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
- চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা।
- এই চুক্তি হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যের গত কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে কি শান্তির আলো দেখা যাচ্ছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ঘোষণা করেছেন যে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি রবিবার, অর্থাৎ তাঁর ৮০তম জন্মদিনেই সই হওয়ার কথা। তাঁর দাবি, এই চুক্তির ফলে শুধু যুদ্ধই থামবে না, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীও আবার সবার জন্য খুলে যাবে।
তবে ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণার বিপরীতে তেহরান অনেক বেশি সতর্ক। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, আলোচনা এগোলেও রবিবারই চুক্তি সই হবে— এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
যুদ্ধ থেকে আলোচনার টেবিলে
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পর যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা কয়েক মাস ধরে সমগ্র পশ্চিম এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তেলের দাম বেড়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওমান, কাতার এবং ইউরোপীয় কূটনীতিকদের সহায়তায় একটি শান্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক খসড়া বিনিময়ের পর এখন উভয় পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি করছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, চুক্তির মূল পাঠ নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরও হতে পারে।
চুক্তির মূল বিষয়গুলি কী?
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালী আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক মাসে এখানকার অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আর কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। মার্কিন প্রশাসনের মতে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংগ্রহ ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করার বিষয়টিও আলোচনার অংশ।
তৃতীয়ত, আমেরিকা ধাপে ধাপে ইরানের উপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে এবং ইরানের তেল রপ্তানির উপর চাপ কমাতে পারে। অন্যদিকে ইরান চায় তার জব্দ হয়ে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ মুক্ত করা হোক।
কোথায় আটকে আছে আলোচনা?
সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য পরমাণু ইস্যুতেই।
ওয়াশিংটন চায় ইরান তার ইউরেনিয়াম মজুত সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিক। কিন্তু তেহরান বলছে, তারা সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির জন্য সীমিত পরিমাণে ইউরেনিয়াম রাখতে চায়।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি, ক্ষতিপূরণ, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, রবিবার যদি কোনও নথি সইও হয়, তা হবে মূলত একটি সমঝোতা স্মারক। তার পরে আরও ৬০ দিন ধরে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত আলোচনা চলবে।
নেতানিয়াহুর অস্বস্তি
এই সম্ভাব্য চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে ইজরায়েলে।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। কিন্তু ট্রাম্প যদি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতায় পৌঁছে যান, তাহলে ইজরায়েলের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ইজরায়েল এই আলোচনার আনুষ্ঠানিক অংশ নয়। ফলে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের অর্থনীতি কেন তাকিয়ে?
শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তেলের দাম কিছুটা নেমেছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমবে।
ভারতের মতো দেশগুলির জন্যও এর গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের তেলের বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ অঞ্চলে ভারতীয় জাহাজের উপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। ফলে স্থিতিশীলতা ফিরলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
রবিবার কী হতে পারে?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ট্রাম্পের ঘোষণা কি বাস্তবে পরিণত হবে?
ওয়াশিংটনের বক্তব্য অত্যন্ত আশাবাদী। ট্রাম্প বলছেন, “চুক্তি সই হওয়ার পরই হরমুজ প্রণালী খুলে যাবে।” অন্যদিকে ইরান বলছে, এখনও কিছু বিষয় মীমাংসিত হয়নি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। কয়েক মাস আগেও যখন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলা চলছিল, তখন এমন একটি চুক্তির সম্ভাবনা কল্পনাতীত ছিল। এখন অন্তত উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে বসেছে এবং যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতির পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
রবিবার ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। সেই দিন যদি সত্যিই ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি সই হয়, তবে তা শুধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবেই নয়, ২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলির একটি হিসেবেও ইতিহাসে স্থান পাবে। কিন্তু তেহরানের সংশয় ইঙ্গিত দিচ্ছে— শেষ মুহূর্তের নাটক এখনও বাকি।