হাইলাইটস:
- সিআইডির একের পর এক সমনের মুখে হাজিরা না দিয়ে আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
- প্রতিটি জবাবে হাইকোর্টে দায়ের করা মামলাকে ঢাল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
- আইনি অধিকার ও তদন্তে সহযোগিতার দায়—দুইয়ের সংঘাত এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
- বিরোধীদের দাবি, এটি আইনের আশ্রয় নয়, সময়ক্ষেপণের কৌশল।
- রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন সমন এড়ানোর ছবি জনমনে উল্টো বার্তাও পাঠাতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে কখনও কখনও কোনও ঘটনা তার আইনি গুরুত্বের চেয়ে রাজনৈতিক গুরুত্বে অনেক বেশি বড় হয়ে ওঠে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে সিআইডির সমন নিয়ে যা ঘটছে, তা ঠিক সেই ধরনেরই একটি ঘটনা। প্রশ্নটা এখন আর শুধু এই নয় যে তিনি তদন্তে কী বলবেন। প্রশ্নটা হল, তিনি তদন্তকারীদের সামনে গিয়ে বলবেন, নাকি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সেই প্রক্রিয়াকেই চ্যালেঞ্জ জানাবেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, সিআইডির পক্ষ থেকে ডাকা হলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি হাজির হচ্ছেন না। তাঁর আইনজীবীরা বারবার জানাচ্ছেন, বিষয়টি ইতিমধ্যেই হাইকোর্টে বিচারাধীন। ফলে আদালতের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তদন্ত প্রক্রিয়া এগোনো উচিৎ নয়। আইনের বিচারে এই যুক্তি অস্বাভাবিক নয়। দেশের যে কোনও নাগরিকের মতো একজন রাজনৈতিক নেতারও আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
কিন্তু রাজনীতির আদালত আইনের আদালতের মতো কাজ করে না।
সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যপটটি অনেক সরল। তদন্তকারী সংস্থা ডাকছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যাচ্ছেন না। কেন যাচ্ছেন না—তার আইনি ব্যাখ্যা যতই জটিল হোক, জনমনে প্রথম প্রশ্নটাই উঠে আসে, “তাহলে কি কিছু লুকোনোর আছে?”
এই প্রশ্নটাই আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
রাজনীতির ইতিহাসে দেখা গেছে, তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্নে নেতারা সাধারণত দুটি পথ বেছে নেন। প্রথম পথ হল সরাসরি সহযোগিতা। তাঁরা যান, জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন, তারপর বেরিয়ে এসে দাবি করেন যে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ নেই। দ্বিতীয় পথ হল তদন্তের বৈধতাকেই আদালতে চ্যালেঞ্জ করা।
অভিষেক বর্তমানে দ্বিতীয় পথেই হাঁটছেন বলে মনে হচ্ছে।
সমস্যা হল, এই পথটি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে মূল বিতর্ক ধীরে ধীরে অভিযোগ থেকে সরে গিয়ে আচরণের দিকে চলে যায়। মানুষ তখন আর জানতে চায় না তদন্তে কী পাওয়া গেল। তারা জানতে চায়, কেন তদন্ত এড়ানো হচ্ছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ঠিক এই জায়গাটিকেই হাতিয়ার করছে। তাদের বক্তব্য, যদি তদন্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হয়, তা হলে গিয়ে সেই প্রতিহিংসার মুখোশ খুলে দেওয়া উচিত। হাজিরা না দিয়ে আদালতের আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন কী?
অবশ্য এই যুক্তিরও পাল্টা যুক্তি রয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তদন্তকারী সংস্থাগুলির নিরপেক্ষতা নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তদন্তের গতি, লক্ষ্য এবং অগ্রাধিকার বদলাতে দেখা গিয়েছে। ফলে কোনও রাজনৈতিক নেতা যদি মনে করেন তদন্তের উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া তাঁর সাংবিধানিক অধিকার।
সুতরাং হাইকোর্টে মামলা করাটাকে নিছক “মামাবাড়ির আবদার” বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু এখানেই আর একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে।
আদালতে মামলা করা এক জিনিস। আর সেই মামলাকে ঢাল করে অনির্দিষ্টকালের জন্য তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া অন্য জিনিস।
হাইকোর্ট যদি স্পষ্টভাবে তদন্ত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু আদালত যদি শুধুমাত্র মামলাটি গ্রহণ করে থাকে, অথচ তদন্তে সহযোগিতা করার পথ খোলা রাখে, তাহলে বারবার সমন এড়ানো রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থান তৈরি করতে পারে।
কারণ গণতন্ত্রে জবাবদিহির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বহু বছর ধরে নিজেকে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বারবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলেছেন। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে জনতার প্রত্যাশার মানদণ্ডও অনেক উঁচু।
যে নেতা অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন, তাঁর নিজের আচরণও সেই মানদণ্ডে বিচারিত হবে—এটাই স্বাভাবিক।
এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে সমন এড়ানোর ছবি সামনে আসতে থাকলে তা তাঁর ভাবমূর্তির ক্ষতি করতে পারে। কারণ তখন বিরোধীরা একটি সহজ এবং কার্যকর রাজনৈতিক বার্তা পেয়ে যায়—“যিনি প্রশ্ন করেন, তিনি নিজে প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না।”
আরও একটি দিক রয়েছে।
রাজনীতিতে অনেক সময় মামলার ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মামলার গল্পটি। আদালতে শেষ পর্যন্ত কে জিতল, সেটা সাধারণ মানুষ অনেক সময় মনে রাখে না। কিন্তু কে তদন্ত থেকে পালাতে চেয়েছিল সেই ধারণা দীর্ঘদিন থেকে যায়।
ভারতীয় রাজনীতিতে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। অনেক নেতা শেষ পর্যন্ত আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু তদন্ত চলাকালীন তাঁদের আচরণ জনমনে এমন ছাপ ফেলেছিল, যা আর পুরোপুরি মুছে যায়নি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি রয়েছে।
যদি তিনি শেষ পর্যন্ত আদালতে সাফল্য পান এবং প্রমাণ করতে পারেন যে তদন্ত প্রক্রিয়াতেই গুরুতর ত্রুটি ছিল, তাহলে বর্তমান কৌশলকে দূরদর্শী আইনি লড়াই হিসেবে দেখা হবে। কিন্তু যদি আদালত তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশ দেয় এবং তারপরও টালবাহানা চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে যেতে পারে।
সেই ক্ষেত্রে বিরোধীদের অভিযোগ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
রাজনীতিতে একটি পুরনো প্রবাদ আছে—“ন্যায়বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়, ন্যায়বিচার হতে দেখা যাওয়াও জরুরি।” একই কথা রাজনৈতিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নির্দোষ হওয়া যথেষ্ট নয়; নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সাহসও দেখাতে হয়।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আজ সেই দ্বিধাবিভক্ত পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাইকোর্টের মামলা তাঁর জন্য সাময়িক রক্ষাকবচ হতে পারে। কিন্তু সেই রক্ষাকবচ যদি ক্রমশ জনমনে আত্মরক্ষার বদলে আত্মগোপনের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষতির মাত্রা আইনি লাভের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
আর সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে যায়—অভিষেক কি একটি কঠিন আইনি লড়াই লড়ছেন, নাকি অজান্তেই এমন একটি রাজনৈতিক গল্প লিখে ফেলছেন, যা একদিন তাঁর বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে?