Home খবর বেইমান হওয়া ভালো, না চোর?

বেইমান হওয়া ভালো, না চোর?

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলার রাজনৈতিক নীতিশাস্ত্রের এক মহাকাব্যিক আবিষ্কার

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 6 views 6 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার রাজনীতি মাঝেমাঝে এমন কিছু উপহার দেয়, যা দার্শনিকরা যুগের পর যুগ চেষ্টা করেও পারেননি। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মানবজাতিকে যে অমৃতবাণী দিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন দাবি করে। তাঁর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ: বেইমান? হ্যাঁ, মানলাম। কিন্তু চোর? না। অতএব, আমি ভালো মানুষ। সক্রেটিস হেমলক খেয়েছিলেন নীতির জন্য। ঋতব্রতবাবু বেইমানি স্বীকার করলেন ক্যারিয়ারের জন্য। দর্শনের ইতিহাসে কে বেশি সৎ, বিচার পাঠকের।

এই যুক্তিটি প্রথম শুনলে হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু একটু ভাবলে বোঝা যায়, এটি আসলে বাংলার রাজনৈতিক নীতিশাস্ত্রের এক গভীর পর্যবেক্ষণ। কারণ এই উক্তিটি শুধু ঋতব্রতবাবুর আত্মপক্ষ নয়, এটি একটি গোটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অলিখিত বিধির প্রকাশ্য স্বীকৃতি। এই সাহসিকতার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। এতদিন সবাই এই বিধিটি মেনে চলতেন, শুধু মুখে বলতেন না। ঋতব্রতবাবু সেই মৌনতার দেওয়াল ভাঙলেন। এটাকে বিপ্লব না বললেও অন্তত সাহস বলতে হয়।

বেইমান: একটি গৌরবময় পদমর্যাদা

“বেইমান” শব্দটি উর্দু থেকে এসেছে। আক্ষরিক অর্থ: যার ইমান নেই, বিশ্বাস নেই, বিবেক নেই। সাধারণত এই অভিযোগ পেলে মানুষ অস্বীকার করেন, রাগেন, কাঁদেন, মামলা করেন, সংবাদ সম্মেলন ডেকে নিজেকে মাদার তেরেসা প্রমাণের চেষ্টা করেন। শব্দটি কারও সম্পর্কে ব্যবহার হলে সমাজে সেই মানুষটির অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়।

ঋতব্রতবাবু বললেন, “ঠিক আছে।”

এই দুটি শব্দে যে নিস্পৃহতা আছে, তা প্রায় আধুনিক কালের অস্তিত্ববাদী দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কামু যেমন তাঁর মার্সোকে দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে মানুষ সমাজের প্রত্যাশিত অনুভূতি দেখাতে অস্বীকার করলে কী হয়, ঋতব্রতবাবুও তেমনি সমাজের প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া — অস্বীকার, ক্রোধ, কান্না — সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেন। তবে পার্থক্যটা এইখানে — কামুর মার্সো অনুভব করতেন না বলে সমস্যায় পড়েছিলেন। ঋতব্রতবাবু অনুভব করেন, কিন্তু গণনা করতে জানেন। এবং তাঁর গণনা নির্ভুল: বেইমান হওয়ার রাজনৈতিক খরচ চোর হওয়ার রাজনৈতিক খরচের চেয়ে অনেক কম।

এই গণনাটা আসলে ভুল নয়। বাংলার রাজনীতিতে গত দশ-পনেরো বছরে এত মানুষ এত বার দল বদলেছেন যে “বেইমান” শব্দটি কার্যত তার দংশন হারিয়ে ফেলেছে, বরং অনেকটা পেশাদার দক্ষতার স্বীকৃতিতে পরিণত হয়েছে। আজকের বেইমান কালকের মিত্র, পরশুর মন্ত্রী, তরশুর আবার বেইমান। কিন্তু “চোর” তকমাটা একটু আঠালো প্রকৃতির, গায়ে লাগলে সহজে ছাড়ে না, ইডি-সিবিআই লাগানো যায়, জামিন নিতে হয়, কোর্টের চক্করে পড়তে হয়। ঋতব্রতবাবু এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝে গিয়েছেন। রাজনৈতিক অর্থনীতির হিসেবে এটা নেহাৎ মন্দ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং বলা যায় এটি মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত একটি পিএইচডি।

দলবদলের ইতিহাস: একটি নিখুঁত ছন্দ, তৃতীয় পাঠ

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের একটি কাব্যিক সামঞ্জস্য আছে, এতটাই নিখুঁত যে মনে হয় কেউ আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছেন। প্রতিটি পর্যায়ে একই ছাঁচ, একই ছন্দ। সিপিএমে গেলেন, গুরুত্বপূর্ণ হলেন, বিতর্কিত হলেন, বহিষ্কৃত হলেন। তৃণমূলে গেলেন, গুরুত্বপূর্ণ হলেন, বিতর্কিত হলেন, বহিষ্কৃত হলেন। এখন নয়া তৃণমূল।

প্রতিটি বিদায়ের সময় তাঁর যুক্তি একটাই: দলটা আর আগের দল নেই। সিপিএম ছাড়ার সময় সিপিএম বদলে গিয়েছিল। তৃণমূল ছাড়ার সময় তৃণমূল বদলে গেছে। এই যুক্তিকাঠামো অনুযায়ী ঋতব্রতবাবু কখনো দল বদলাননি, দলগুলো তাঁকে বারবার ছেড়ে চলে গেছে। তিনি একটি চিরস্থির ধ্রুবতারা, চারদিকে রাজনৈতিক দলগুলো অকৃতজ্ঞভাবে ভেসে যাচ্ছে।

এই যুক্তির একটি সুবিধা আছে — খণ্ডন করা কঠিন, কারণ দলগুলো সত্যিই বদলায়। কিন্তু যখন পরপর তিনটি সংগঠন একই ব্যক্তির সঙ্গে হুবহু একই পরিণতিতে পৌঁছায়, তখন পরিসংখ্যানবিদরা একটু সংশয়ী হন। একবার যদি দুর্ভাগ্য হয়, দু’বার হলে কাকতাল, তিনবার হলে প্যাটার্ন। ঋতব্রতবাবু তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছেন। এটাকে দুর্ভাগ্য বলা যাচ্ছে না, কাকতালও বলা কঠিন কিন্তু রাজনীতিতে প্যাটার্নকে “অভিজ্ঞতা” বলার রেওয়াজ আছে।

তবে তাঁর সপক্ষে একটি কথা বলার আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তৃণমূল তাঁকে সাংসদ করেছে, বিধায়ক করেছে, তখন ঋতব্রতবাবু বলেছেন, “দিদি সম্মানীয় নেত্রী, তাঁকে কিছু বলব না।” এই সংযম লক্ষণীয়, এমনকি প্রশংসনীয়। একজন মানুষ যিনি দলের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন, তিনি দলনেত্রীকে সম্মানীয় বলছেন — এটাকে বিচক্ষণতা বলা যায়, কারণ মমতাকে আক্রমণ না করলে ভবিষ্যতে নয়া তৃণমূলের সঙ্গে পুরনো তৃণমূলের একটা সমঝোতার রাস্তা খোলা থাকে। রাজনীতিতে আজকের শত্রু কালকের মিত্র — এই চিরন্তন সত্যটি ঋতব্রতবাবু হাড়ে হাড়ে জানেন, এবং সেই জ্ঞান তিনি বিসর্জন দেননি।

অভিষেকের উপর তোপ: শল্যচিকিৎসার নির্ভুলতায়

তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ঋতব্রতবাবু মমতাকে আক্রমণ না করে সরাসরি নিশানা করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই কৌশলটি বাংলার রাজনীতিতে এখন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-ঘরানায় পরিণত হয়েছে — নাম “দিদিকে ভালোবাসি, ভাইপোকে নয়।” এই ঘরানায় অভিষেককে সব সমস্যার উৎস হিসেবে দেখানো হয়, আর মমতাকে একজন নিষ্পাপ নেত্রী হিসেবে যাঁকে ভুল পরামর্শদাতারা ঘিরে রেখে বিপথে নিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক সংস্করণে এটাকে “রাজা ভালো, মন্ত্রী খারাপ” তত্ত্ব বলা যায়, যা ইতিহাসে বহুবার ব্যর্থ হয়েছে এবং বহুবার ব্যবহৃতও হয়েছে।

এই ন্যারেটিভটি চালাক, কারণ এটি একই সঙ্গে দুটো কাজ করে। এক, মমতার সমর্থকদের মধ্যে যাঁরা অভিষেককে পছন্দ করেন না, তাঁদের কাছে সহানুভূতি তৈরি হয়। দুই, মমতার সঙ্গে ভবিষ্যতের সংলাপের দরজা জীবিত থাকে। কিন্তু এই কৌশলের একটি দুর্বলতাও আছে, এবং সেটা মারাত্মক: এত বিধায়ক যদি সত্যিই অভিষেকের বিরুদ্ধে এবং মমতার পক্ষে হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে — নির্বাচনী প্রচারে তাঁরা তখন কোথায় ছিলেন? মঞ্চে ছিলেন, নাকি বিবেকের আড়ালে? সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেননি। এবং সম্ভবত দেবেনও না, কারণ রাজনীতিতে অতীতের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

নয়া তৃণমূল: নামকরণের এক অসাধারণ নান্দনিকতা

“নয়া তৃণমূল কংগ্রেস” — এই নামটি বাজার-অর্থনীতির এক অনন্য প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক কল্পনাশক্তির পরিচয়। পুরনো ব্র্যান্ডের সুবিধা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পুরনো ব্র্যান্ডের দায় নেওয়া হচ্ছে না। এটা অনেকটা ব্যর্থ রেস্তোরাঁর পাশে “নিউ” লিখে দেওয়ার মতো — মেনু একই, রাঁধুনি একই, পুরনো তেলে নতুন পকোড়া কিন্তু আশা করা হচ্ছে যে নামের পরিবর্তনে মানুষ ভুলে যাবে।

তবে এই নামকরণে একটি অনিচ্ছাকৃত স্বীকারোক্তিও লুকিয়ে আছে। “নয়া” বলতে গেলে স্বীকার করতে হয় যে “পুরনো” ছিল এবং সেটা কাজের ছিল না। অর্থাৎ নয়া তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতারা প্রকারান্তরে স্বীকার করছেন যে তাঁরা এতদিন একটি ব্যর্থ সংগঠনের অংশ হয়ে মাইনে তুলেছেন, পদ ভোগ করেছেন, এবং এখন হঠাৎ বিবেক জেগে উঠেছে। এই আত্মসমালোচনামূলক সততার জন্যও তাঁদের অভিনন্দন জানানো যায়, দেরিতে হলেও তাঁরা সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন।

বেইমান বনাম চোর: বাংলার রাজনীতির আসল মানদণ্ড

ঋতব্রতবাবুর উক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে তা হলো, এটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে সংরক্ষিত অলিখিত সত্যকে প্রকাশ্যে টেনে এনে ফেলেছে। সেই সত্যটি হলো: এই রাজনীতিতে আনুগত্য একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য, দাম ওঠানামা করে, বাজার দেখে বেচা হয়। কিন্তু সম্পদ হরণ এখনো কিছুটা সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর — আদালত আছে, সংবাদমাধ্যম আছে, মাঝেমাঝে ইডিও আছে। প্রথমটা করলে পরের দলে ঢোকা যায়, দ্বিতীয়টা করলে অন্তত কিছুটা কৈফিয়ত দিতে হয়।

এই পার্থক্যটি বাংলার মানুষ বোঝেন। তাঁরা জানেন কোন নেতা কখন কোথায় গেছেন এবং কেন গেছেন। তাঁরা জানেন দলবদলের পেছনে নীতি থাকে না, থাকে গণনা — টিকিটের গণনা, পদের গণনা, ক্ষমতার গণনা। কিন্তু তাঁরা এও জানেন যে রাজনীতির এই খেলায় দলবদলকে ঠেকানোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেই। দলত্যাগ বিরোধী আইন আছে, কিন্তু সেই আইনও রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী প্রয়োগ হয় অর্থাৎ আইনটিও একটু বেইমান।

তাই ঋতব্রতবাবু যখন বললেন “বেইমান বলুন, ঠিক আছে”, তখন তিনি শুধু নিজের কথা বলেননি। তিনি বললেন: এই রাজনীতিতে আমি যা করেছি তা স্বাভাবিক, এটা সবাই করেছে, করছে, করবে। শুধু আমিই প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস দেখালাম। বাকিরা লজ্জায় চুপ থাকেন।

এই স্বীকারোক্তিটি একটি আয়না। এবং সেই আয়নায় যা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ নয়, পুরো বাংলার রাজনীতির চেহারা।

ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী: সম্ভাবনার নির্মম হিসেব

নয়া তৃণমূলের যাত্রা সবে শুরু। এই মুহূর্তে দাবি করা হচ্ছে পঞ্চাশের বেশি বিধায়কের সমর্থন আছে। কিন্তু বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে বিধায়কদের সমর্থন একটি তরল পদার্থ — পাত্র বদলে নেয়, তাপমাত্রা অনুযায়ী আকার পরিবর্তন করে, প্রয়োজনে বাষ্প হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

যদি নয়া তৃণমূল টিকে যায়, তাহলে ঋতব্রতবাবু একজন সফল বিদ্রোহীর ইতিহাস পাবেন — ইতিহাসবিদরা লিখবেন, সাংবাদিকরা সাক্ষাৎকার নেবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেস স্টাডি হবে। আর যদি না টেকে? তাহলে হয়তো কিছুদিন পর দেখা যাবে, নয়া তৃণমূল আর আগের নয়া তৃণমূল নেই। এবং সেই নয়া তৃণমূলেও “বেইমান বলুন, ঠিক আছে” নীতিটি সমান প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকর থাকবে।

কারণ এই উক্তিটি নির্দিষ্ট কোনো দলের নীতি নয়, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির দর্শন নয়। এটি বাংলার সমসাময়িক রাজনীতির সার্বজনীন জাতীয় সংগীত — সবাই গায়, কেউ স্বীকার করে না। ঋতব্রতবাবু স্বীকার করলেন। এবং যতদিন এই দর্শন টিকে থাকবে, ততদিন তাঁর এই উক্তিটি রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি রাখে — “নীতিশাস্ত্র” অধ্যায়ে নয়, “বাস্তববাদ” অধ্যায়ে।

বরং একটু ভেবে দেখলে, বাংলার রাজনীতিতে এই দুটো অধ্যায় এখন আর আলাদা নয়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles