Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন্দে মাতরম সংক্রান্ত নতুন নির্দেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। রাজ্যের স্কুল ও সরকার-স্বীকৃত মাদ্রাসাগুলিতে সকালের প্রার্থনায় বন্দে মাতরমের ছয়টি স্তবক আবৃত্তি বা গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড (এআইএমপিএলবি)। সংগঠনটি দাবি করেছে, এই নির্দেশ মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এআইএমপিএলবি-র মুখপাত্র এস কিউ আর ইলিয়াস বলেন, কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো গান বা পাঠ আবৃত্তি করতে বাধ্য করা সংবিধানবিরোধী। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশ মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পরিচয়ের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কী বলছে মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড?
বোর্ডের বক্তব্য, বন্দে মাতরমের কিছু অংশে এমন প্রতীক ও ধারণা রয়েছে যা ইসলামের একেশ্বরবাদী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বহু মুসলিম মনে করেন। সেই কারণে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের ওই গান গাইতে বাধ্য করা হলে তা তাদের বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালনের অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
ইলিয়াস দাবি করেন, সংবিধানের ১৯, ২৫ এবং ২৮(৩) নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মাচরণের অধিকার এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। তাঁর মতে, রাজ্যের নতুন নির্দেশ এই মৌলিক অধিকারগুলিকে খর্ব করছে। বোর্ড আরও জানিয়েছে, সরকার যদি নির্দেশ প্রত্যাহার না করে, তাহলে তারা আদালতের দ্বারস্থ হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উল্লেখ
এআইএমপিএলবি তাদের বক্তব্যের সমর্থনে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘বিজো এম্যানুয়েল বনাম কেরল সরকার’ মামলার রায়ের কথা উল্লেখ করেছে। ১৯৮৬ সালের ওই মামলায় আদালত বলেছিল, কোনো নাগরিককে তার আন্তরিক ধর্মীয় বা নৈতিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে জাতীয় সঙ্গীত বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা যায় না। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের মতে, সেই রায়ের আলোকে বর্তমান নির্দেশের সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত কী?
গত মাসে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার প্রথমে শিক্ষা দপ্তরের অধীন সমস্ত স্কুলে বন্দে মাতরমের ছয়টি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করে। পরে সেই নির্দেশ সরকার-স্বীকৃত মাদ্রাসাগুলির ক্ষেত্রেও কার্যকর করা হয়।
সরকারের যুক্তি, বন্দে মাতরম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস এবং জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের প্রতীক। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জাতীয় চেতনা গড়ে তুলতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, বন্দে মাতরম নিয়ে আপত্তি তোলা আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশ্নে আপস করা যায় না।
বিতর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্য
বন্দে মাতরমকে কেন্দ্র করে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার আগে থেকেই গানটির নির্দিষ্ট কিছু অংশ নিয়ে মুসলিম সমাজের একাংশ আপত্তি জানিয়ে এসেছে। স্বাধীনতার পরেও বিভিন্ন সময়ে এই ইস্যু রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর এটি প্রথম বড় সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। একদিকে বিজেপি সরকার জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে জোরালো করতে চাইছে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলি ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে পাল্টা অবস্থান নিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি গানকে ঘিরে নয় বরং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক নীতি, ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
আদালতের দিকেই নজর
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায় কি না। এআইএমপিএলবি ইতিমধ্যেই আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। যদি মামলা দায়ের হয়, তাহলে আদালতকে নির্ধারণ করতে হবে জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার সরকারি উদ্যোগ এবং ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কোথায় টানা হবে।
ফলে বন্দে মাতরম বিতর্ক এখন আর শুধুমাত্র শিক্ষা নীতির প্রশ্ন নয়। এটি ক্রমশ পরিণত হচ্ছে সংবিধান, ধর্মীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমা নিয়ে এক বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায়। পশ্চিমবঙ্গ সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।