হাইলাইটস:
- কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হল তিনটি নতুন জাহাজ।
- ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত স্টেলথ ফ্রিগেট আইএনএস দুনাগিরি দূর সমুদ্রে যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম।
- আইএনএস সংশোধক সমুদ্রের গভীরতা, তলদেশ ও নৌপথের মানচিত্র তৈরির কাজ করবে।
- আইএনএস আগ্রয় উপকূলবর্তী অগভীর জলে শত্রু সাবমেরিন শনাক্ত ও ধ্বংসের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত।
- তিনটি জাহাজেই ৭৫ শতাংশের বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার হয়েছে, যা আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করল।
বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতায় রবিবার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে একসঙ্গে যুক্ত হল তিনটি অত্যাধুনিক জাহাজ— আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস আগ্রয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে এই কমিশনিং অনুষ্ঠান শুধু নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিরই প্রতীক নয়, বরং ভারতের ক্রমবর্ধমান দেশীয় জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতারও বড় প্রদর্শন।
তিনটি জাহাজই কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)-এ নির্মিত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজগুলিতে ৭৫ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে এবং নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ২০০-রও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংস্থা অংশ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী জাহাজটি হল আইএনএস দুনাগিরি। এটি একটি স্টেলথ গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট, যা ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রজেক্ট ১৭এ-র অধীনে নির্মিত। ‘স্টেলথ’ অর্থ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হওয়া নয়; বরং রাডার ও অন্যান্য সেন্সরে সহজে ধরা না পড়ার ক্ষমতা। দুনাগিরিতে রয়েছে ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, মাঝারি পাল্লার ভূমি-থেকে-আকাশে আঘাতকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক রাডার, সোনার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী অস্ত্র।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এই ধরনের ফ্রিগেট গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালাতে পারে এবং প্রচলিত ও অপ্রচলিত— উভয় ধরনের হুমকির মোকাবিলা করতে সক্ষম। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারে দুনাগিরির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে আইএনএস সংশোধকের কাজ সরাসরি যুদ্ধ নয়, কিন্তু যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বৃহৎ সমুদ্র জরিপ জাহাজ। সমুদ্রের গভীরতা, তলদেশের গঠন, বন্দরমুখী নৌপথ, প্রবেশ চ্যানেল এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ ও মানচিত্রায়নের কাজ করবে এই জাহাজ।
সংশোধকে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় জলের নিচের যান, দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র এবং বহু-বিম প্রতিধ্বনি পরিমাপক প্রযুক্তি। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সমুদ্রের উপরিভাগ ও তলদেশের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, বাণিজ্যিক জাহাজ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থাগুলির জন্য এই তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান।
সংশোধক হল সন্ধায়ক শ্রেণির চতুর্থ এবং শেষ জাহাজ। এর আগে আইএনএস সন্ধায়ক, নির্দেশক এবং ইক্ষক ইতিমধ্যেই নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তৃতীয় জাহাজ আইএনএস আগ্রয় আকারে ছোট হলেও তার দায়িত্ব অত্যন্ত বিশেষায়িত। এটি অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট বা উপকূলীয় সাবমেরিন-শিকারি জাহাজ। উপকূলের কাছাকাছি অগভীর জলে শত্রু সাবমেরিন খুঁজে বের করে ধ্বংস করার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে।
উপকূলবর্তী সমুদ্রাঞ্চলে সাবমেরিন শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। মাছ ধরার নৌকা, বাণিজ্যিক জাহাজ, সমুদ্রতলের বৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় কর্মকাণ্ডের কারণে সেখানে শব্দ ও বিভ্রান্তি অনেক বেশি থাকে। সেই জটিল পরিবেশে কাজ করার জন্য আগ্রয়কে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে। এতে রয়েছে উন্নত সোনার ব্যবস্থা, হালকা টর্পেডো এবং দেশীয় সাবমেরিন-বিধ্বংসী রকেট লঞ্চার।
এই তিনটি জাহাজকে একসঙ্গে কমিশন করার মধ্যে একটি স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা রয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনী একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে যুদ্ধক্ষমতা, সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা— এই তিন ক্ষেত্রেই নিজেদের শক্তিশালী করছে।
বর্তমানে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও পাকিস্তানের নৌ-তৎপরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের দায়িত্বও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে দুনাগিরি, সংশোধক এবং আগ্রয়ের কমিশনিং নৌবাহিনীর বহুস্তরীয় সক্ষমতা গঠনের কৌশলকে সামনে নিয়ে এল।
একদিকে দূর সমুদ্রে শক্তি প্রদর্শনের জন্য আধুনিক ফ্রিগেট, অন্যদিকে সমুদ্রকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য জরিপ জাহাজ, এবং উপকূল রক্ষায় সাবমেরিন-শিকারি যুদ্ধজাহাজ— এই তিনের সমন্বয়ই ভবিষ্যতের ভারতীয় নৌ-কৌশলের ভিত্তি গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে যে ভারত এখন বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ নিজস্ব প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তির উপর নির্ভর করেই নির্মাণ করতে সক্ষম।