রাজ্যের ২,০০০ কিলোমিটার সড়ক হবে জাতীয় মহাসড়ক

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি রাজ্য সড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্র।
- প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই তালিকা রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ির কাছে দিয়েছিলেন।
- ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্র প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি রাজ্য সড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্র। প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই তালিকা রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী অজয় পোদ্দার কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ির কাছে দিয়েছিলেন। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্র প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। কিন্তু ‘প্রক্রিয়া শুরু’ মানে ১৬টি সড়ক ইতিমধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ঘোষিত বা নির্মাণের টাকা মঞ্জুর—এমন নয়। প্রতিটি পথের জরিপ, নীতিগত অনুমোদন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও প্রকল্প ব্যয় আলাদা ধাপ।
তালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সীমান্ত-সংযোগ। মালদহ–গৌড়–মহদিপুর এবং চাকদহ–বনগাঁ–পেট্রাপোল পথকে জাতীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পেট্রাপোল স্থলবন্দর ভারত-বাংলাদেশ পণ্য ও যাত্রী চলাচলের বড় দরজা; সড়কের ক্ষমতা বাড়লে পণ্যবাহী গাড়ির সময় কমতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তে পার্কিং, শুল্ক পরীক্ষার জায়গা ও স্থানীয় গ্রামের নিরাপত্তা না-বাড়ালে চওড়া রাস্তা একাই যানজট দূর করবে না।
অন্য প্রস্তাবিত পথের মধ্যে দুর্গাপুর–বাঁকুড়া, পুরুলিয়া–বরাকর, মহম্মদবাজার–সাঁইথিয়া–কান্দি এবং আসানসোলের জুবিলি মোড় থেকে জামতাড়া সড়ক রয়েছে। গঙ্গাসাগর-সংযোগের পথও তালিকায় থাকার কথা প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরে শিল্পতালুক এবং নতুন প্রতিরক্ষা কারখানার পরিকল্পনার সঙ্গে ভারী পণ্য পরিবহণের প্রয়োজন যুক্ত। পথগুলির পূর্ণ সরকারি তালিকা ও মানচিত্র প্রকাশ হলে কোন জনপদ কতটা প্রভাবিত হবে, তা পরিষ্কার হবে।
জাতীয় মহাসড়ক ঘোষণার পরে রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের বড় আর্থিক দায় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যায়; ফলে রাজ্য অন্য জেলা ও গ্রামীণ সড়কে অর্থ সরাতে পারবে বলে পূর্ত দফতরের যুক্তি। তবে জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় অনুমতি, নিকাশি ও পরিষেবা-রাস্তার কাজে রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা থেকেই যায়। রাস্তার নাম বদলালেই গর্ত, দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড় বা বাজারের যানজট সঙ্গে সঙ্গে সরে না।
প্রকল্প পরিকল্পনায় পথের দু’ধারের বাসিন্দা, দোকান, কৃষিজমি ও বনাঞ্চলের প্রশ্ন উঠবে। চার বা ছয় লেনের নকশা হলে জমির প্রয়োজন বাড়তে পারে; ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও পথ পারাপারের নিরাপদ ব্যবস্থা আগে জানানো প্রয়োজন। স্কুল, হাসপাতাল ও বাজারের কাছে পদচারী সেতু বা নিয়ন্ত্রিত গতি না-থাকলে দ্রুত সড়ক স্থানীয় মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় মহাসড়ক ঘোষণা কেন্দ্রীয় গেজেটের মাধ্যমে হয়। তার আগে পথটি জাতীয় বা আন্তঃরাজ্য সংযোগ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পর্যটন, বন্দর বা সীমান্ত-প্রয়োজনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সেই মূল্যায়ন হয়। পরে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন পথের প্রস্থ, সেতু, বাইপাস, জমি ও ব্যয় নির্ধারণ করে। একই তালিকার সব সড়ক একই দিনে বা একই মানে উন্নীত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনও অংশ বর্তমান রেখাতেই উন্নত হতে পারে, অন্য অংশে বাইপাস দরকার হতে পারে।
মহদিপুর ও পেট্রাপোলের পথে সীমান্ত বাণিজ্য বাড়লে ট্রাক-টার্মিনাল, চালকের বিশ্রাম, শৌচাগার ও ডিজিটাল শুল্ক-সারি প্রয়োজন। দুর্গাপুর–বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া–বরাকর শিল্পপথে ভারী গাড়ির জন্য সেতুর ক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। গঙ্গাসাগরের পথে আবার উৎসবকেন্দ্রিক বিপুল যাত্রীচাপ প্রধান। এক নকশায় এই তিন ধরনের সমস্যা মেটে না; পথভিত্তিক পরিষেবা-পরিকল্পনা জাতীয় মর্যাদার সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষণ: রাজ্যের শিল্প ও সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য সড়ক উন্নয়ন প্রয়োজনীয়। কিন্তু দু’হাজার কিলোমিটারের মোট অঙ্কের চেয়ে কোন পথ কখন বিজ্ঞাপিত, কত টাকা বরাদ্দ এবং কত কিলোমিটার কাজ শুরু হল—এই সূচক বেশি নির্ভরযোগ্য। ‘দু’মাসে মাঠে কাজ’ প্রশাসনিক প্রত্যাশা; কেন্দ্রীয় বিজ্ঞপ্তি ও দরপত্র ছাড়া সেটিকে নিশ্চয়তা বলা যাবে না।
একটি প্রকাশ্য প্রকল্পফলক দরকার, যেখানে প্রতিটি সড়কের বর্তমান অবস্থা, অনুমোদনের ধাপ, জমি, পরিবেশ ছাড়পত্র, কাজের সময় ও দুর্ঘটনার তথ্য থাকবে। সীমান্ত সড়কে পণ্য চলাচল বাড়লে স্থানীয় বায়ুদূষণ ও ভারী গাড়ির চাপও মাপতে হবে। জাতীয় মর্যাদা তখনই উন্নয়ন হবে, যখন দ্রুত যাত্রার পাশাপাশি গ্রামের সংযোগ, নিরাপত্তা ও জীবিকার ক্ষতি ন্যায্যভাবে সামলানো যায়। প্রস্তাবিত প্রতিটি পথের সরকারি বিজ্ঞপ্তিই এখন সংবাদটির পরবর্তী যাচাইযোগ্য ধাপ এবং বাস্তব কাজ শুরুর প্রথম শর্ত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



