পাঁচ মাসে খনিজ রাজস্ব ৩৩ শতাংশ বেশি

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গে ১৬ এপ্রিল থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত খনিজ খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৬৭ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা।
- আগের বছরের একই সময়ে আদায় ছিল ৪২৮ কোটি ২০ লক্ষ টাকা।
- বৃদ্ধি ১৩৯ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা বা প্রায় ৩৩ শতাংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে ১৬ এপ্রিল থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত খনিজ খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৬৭ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে আদায় ছিল ৪২৮ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। বৃদ্ধি ১৩৯ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা বা প্রায় ৩৩ শতাংশ। রাজ্য সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বীরভূম ২৩৫ কোটি টাকা নিয়ে জেলা-তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
এর পরে রয়েছে ঝাড়গ্রাম—৭০ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা, পূর্ব বর্ধমান—৫৬ কোটি ১২ লক্ষ, বাঁকুড়া—৫৩ কোটি ৬ লক্ষ এবং পশ্চিম বর্ধমান—৪৮ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা। এই পাঁচ জেলার যোগফল মোট সংগ্রহের বড় অংশ। পাথর, বালি ও অন্যান্য খনিজের ভৌগোলিক উপস্থিতির পাশাপাশি পরিবহণ, রয়্যালটি এবং ই-চালান ব্যবস্থার কারণে জেলাভেদে অঙ্ক আলাদা হয়।
সরকারি আধিকারিকেরা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রশাসনিক নজরদারি, পুলিশি ব্যবস্থা এবং রাজস্ব ফাঁকি নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগের সময়ে বেআইনি খননে বিপুল ক্ষতির রাজনৈতিক অভিযোগ তুলেছেন। বর্তমান রাজস্ব বৃদ্ধি যাচাইযোগ্য হিসাব; আগের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা নির্দিষ্ট ক্ষতির দাবি পৃথক তদন্ত ও নিরীক্ষা ছাড়া প্রমাণিত নয়।
একইভাবে ৩৩ শতাংশ আয় বৃদ্ধি মানেই খনিজ উৎপাদন ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, এমন নয়। পণ্যের দাম, রয়্যালটির হার, নতুন নিলাম, পুরনো বকেয়া আদায়, বৈধ পরিবহণের অনুপাত এবং প্রশাসনিক জরিমানা—সবই রাজস্ব বদলাতে পারে। খনিজভিত্তিক পরিমাণ ও গড় মূল্য প্রকাশ না-হলে বৃদ্ধির আসল উৎস আলাদা করা যায় না।
অবৈধ খনন নিয়ন্ত্রণে ই-চালান ও যানবাহনের নজরদারি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বৈধ কাগজ থাকা মানেই প্রতিটি ট্রাক অনুমোদিত ওজন বহন করছে বা নির্ধারিত খাদান থেকেই খনিজ এনেছে, তার নিশ্চয়তা নয়। উৎসস্থলের মাপ, ওজনসেতুর নথি, জিপিএস এবং গন্তব্যের হিসাব মিললে একই চালান পুনর্ব্যবহারের সুযোগ কমে।
বীরভূম, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামের খাদান-অঞ্চলে রাজস্বের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষতির হিসাবও প্রয়োজন। পাথরের ধুলো, বিস্ফোরণের কম্পন, ভারী ট্রাকের রাস্তা, ভূগর্ভস্থ জল এবং কৃষিজমির উপর প্রভাব নিয়ে বহুদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। কোনও অভিযোগ সত্য কি না প্রকল্পভিত্তিক পরিবেশ-তথ্য ও পরিদর্শনে নির্ধারিত হবে; মোট রাজস্ব সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
বালি তোলার ক্ষেত্রেও নদীর বহনক্ষমতা, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা এবং সেতু–বাঁধের নিরাপত্তা জরুরি। অনুমোদিত ঘাট থেকে নির্ধারিত গভীরতার বেশি বালি উঠলে সরকারের রয়্যালটি জমা পড়লেও নদীর ক্ষতি বৈধ হয়ে যায় না। জেলা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রে নির্ধারিত সীমা মাঠে মানা হচ্ছে কি না, তা প্রকাশ্য পরিদর্শন দরকার।
খনিজ থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়নে ব্যবহারের জন্য জেলা খনিজ ফাউন্ডেশনের মতো ব্যবস্থা রয়েছে। পানীয় জল, স্বাস্থ্য, ধুলো নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের সুরক্ষায় কত টাকা খরচ হয়েছে—জেলা অনুযায়ী জানা প্রয়োজন। খনিজবাহী ট্রাকে ভাঙা রাস্তা সারাতে স্থানীয় পঞ্চায়েতের অর্থ গেলে রাজস্ব বৃদ্ধির পূর্ণ লাভ রাজ্য পায় না।
শ্রমিকের নিরাপত্তাও আয়ের বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বৈধ খাদানে হেলমেট, ধুলো-প্রতিরোধ, বিস্ফোরণের প্রশিক্ষণ এবং দুর্ঘটনার বিমা থাকা উচিত। অনিবন্ধিত শ্রমিক আহত হলে উৎপাদন ও রাজস্বের নথিতে তাঁর অস্তিত্বই ধরা নাও পড়তে পারে। দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগের প্রকাশ্য হিসাব তাই দরকার।
পাঁচ মাসে ৩৩ শতাংশ বেশি সংগ্রহ রাজস্ব প্রশাসনের অগ্রগতির সম্ভাব্য সংকেত। কিন্তু এটি একা অবৈধ খনন বন্ধ হওয়া বা পরিবেশসম্মত উৎপাদনের প্রমাণ নয়। খনিজভিত্তিক উত্তোলন, রয়্যালটি, বকেয়া, জরিমানা, ই-চালান এবং পরিবেশগত লঙ্ঘন আলাদাভাবে প্রকাশ করলে বৃদ্ধির অর্থ বোঝা যাবে। মাটির নিচের সম্পদ থেকে রাজ্যের আয় বাড়া ভালো; যে জেলার মাটি ও মানুষ তার মূল্য দিচ্ছে, তাদের নিরাপত্তা ও উন্নয়নও একই হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



