‘গান নয়, এখন তৈরি হচ্ছে রিল’: সঙ্গীতের দশা নিয়ে হরিহরণ

যা জানা জরুরি
- আগামী বছর ভারতীয় সঙ্গীতজগতে তাঁর পথচলার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে।
- দীর্ঘ এই সফরের দিকে কৃতজ্ঞতা ও গর্ব নিয়ে ফিরে তাকালেও বর্তমান সঙ্গীতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে একেবারেই সন্তুষ্ট নন প্রবীণ গায়ক হরিহরণ।
- তাঁর আক্ষেপ, সুর ও সৃষ্টিশীলতার জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে পনেরো সেকেন্ডের আকর্ষণীয় অংশ, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার তাগিদ আর শ্রোতার পছন্দ মাপার যান্ত্রিক হিসাব।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আগামী বছর ভারতীয় সঙ্গীতজগতে তাঁর পথচলার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে। দীর্ঘ এই সফরের দিকে কৃতজ্ঞতা ও গর্ব নিয়ে ফিরে তাকালেও বর্তমান সঙ্গীতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে একেবারেই সন্তুষ্ট নন প্রবীণ গায়ক হরিহরণ। তাঁর আক্ষেপ, সুর ও সৃষ্টিশীলতার জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে পনেরো সেকেন্ডের আকর্ষণীয় অংশ, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার তাগিদ আর শ্রোতার পছন্দ মাপার যান্ত্রিক হিসাব। আর তাতেই গান হারাচ্ছে তার আত্মা।
হরিহরণের মতে, কোন গান বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে, কোন অংশটি সমাজমাধ্যমে জনপ্রিয় হবে কিংবা শ্রোতা কতক্ষণ গানটি শুনবেন—এ সব হিসাব মাথায় রেখে সঙ্গীত তৈরি করতে গেলে প্রকৃত সৃষ্টির জায়গাটাই সংকুচিত হয়ে আসে। তাই তাঁর তীক্ষ্ণ মন্তব্য, ‘‘আমরা আর সঙ্গীত তৈরি করছি না, আমরা রিল তৈরি করছি।’’
তাঁর বক্তব্য, তথ্য ও যান্ত্রিক হিসাব যখন সৃষ্টির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন শিল্পীর ভাবনাও আর সঙ্গীতকে ঘিরে থাকে না। গান তৈরির আগে মাথায় চলে আসে তার সম্ভাব্য ‘রিচ’, জনপ্রিয় হওয়ার মতো অংশ কিংবা সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। ফলে সৃষ্টিশীলতার স্বতঃস্ফূর্ততাই হারিয়ে যায়।
শুধু গান তৈরির ধরন নয়, গান শোনার অভ্যাসও আমূল বদলে গিয়েছে বলে মনে করেন হরিহরণ। একসময় পছন্দের শিল্পীর একটি অ্যালবাম কিনতেন শ্রোতারা। সেই অ্যালবামের সঙ্গে তৈরি হত একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক। বারবার গান শোনা, প্রচ্ছদ দেখা, গানের কথা পড়া—সব মিলিয়ে অ্যালবাম হয়ে উঠত স্মৃতির অংশ।
এখন সেই অভিজ্ঞতা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। শ্রোতারা কোনও নির্দিষ্ট গান বা অ্যালবামের জন্য অর্থ খরচ না করে গান শোনার প্ল্যাটফর্মের সদস্যপদ কিনছেন। হাতের মুঠোয় লক্ষ লক্ষ গান পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সৃষ্টির সঙ্গে সেই পুরনো মালিকানা, অপেক্ষা এবং আবেগের সম্পর্কটি আর তৈরি হচ্ছে না।
সহজলভ্যতাই উল্টো গানের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন হরিহরণ। মুঠোফোনে গান শোনার অভিজ্ঞতাকে তিনি হতাশাজনক বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি গানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মন দিয়ে গান শোনার সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে। গান এখন অনেক সময় স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম না হয়ে অন্য কাজের নেপথ্যসঙ্গী কিংবা কয়েক মুহূর্তের বিনোদন মাত্র।
নব্বইয়ের দশকে লেসলি লুইসের সঙ্গে ‘কলোনিয়াল কাজিনস’ গড়ে ভারতীয় সঙ্গীতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন হরিহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, সেই সময়ে পরীক্ষানিরীক্ষা ও সৃষ্টিশীলতার জন্য জায়গা ছিল অনেক বেশি। তবে বর্তমান সঙ্গীতের ছবিটা নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন তিনি। সোনু নিগম, শান, উদিত নারায়ণ, শ্রেয়া ঘোষালের মতো শিল্পীরা ফের চলচ্চিত্রের গানে গুরুত্ব পাচ্ছেন—এতেই আশার আলো দেখছেন তিনি।
কেন এই পরিবর্তন? হরিহরণের ব্যাখ্যা, শ্রোতার উপরে আচমকা কোনও নতুন রীতি চাপিয়ে দিলে তাঁরা সাময়িকভাবে তা মেনে নিলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের পছন্দের পক্ষে প্রতিবাদ করেন। কারণ, ক্ষণস্থায়ী প্রবণতা নয়, ভাল সুরের আবেদনই প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে।
হরিহরণের বিশ্বাস, তাঁদের গান আজও প্রাসঙ্গিক হওয়ার অন্যতম কারণ তারুণ্যে ভরা সেই সুর। নতুন প্রজন্মও সেই সঙ্গীতের সঙ্গে নিজেদের মতো করে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। তাই রিল, অ্যালগরিদম আর ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ডের ভিড় যতই বাড়ুক, শেষ পর্যন্ত শ্রোতার মনে জায়গা করে নেবে ভাল গানই—হরিহরণের বক্তব্যের সারকথা যেন সেখানেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



