শিল্পপতি মুকেশ অম্বানী এবং তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুরুতর অভিযোগ তুললেন এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান তথা জি টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্র। তাঁর অভিযোগ, জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনালে চলা ব্যক্তিগত দেউলিয়া মামলার রায় নিয়ে রিলায়্যান্সের সংবাদমাধ্যমগুলি ইচ্ছাকৃত ভাবে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালিয়েছে। রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ অবশ্য অভিযোগগুলি ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

জি নিউজে প্রচারিত এক ভিডিয়ো-বার্তায় সুভাষ বলেন, “এই প্রথম আমি কোনও অত্যন্ত বড় শিল্পপতি এবং শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কিছু বলতে চলেছি।” সরাসরি মুকেশ অম্বানীর নাম করে তিনি দাবি করেন, রিলায়্যান্সের সংবাদমাধ্যম সংস্থা টিভি১৮ গোষ্ঠী—যার অন্তর্ভুক্ত সিএনবিসি-টিভি১৮—প্রথম এই ‘ভুল তথ্য’ প্রচার করে যে, জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনাল সুভাষ চন্দ্রের ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ মাত্র সাড়ে ছ’কোটি টাকায় মিটিয়ে দিয়েছে।

সুভাষের বক্তব্য, ২২ হাজার কোটি টাকা তাঁর ব্যক্তিগত ভাবে নেওয়া ঋণ নয়। এসেল গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত জামিনদার ছিলেন। ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলির দায় এবং জামিনদার হিসাবে তাঁর ব্যক্তিগত দায়কে এক করে দেখিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে বলেই তাঁর অভিযোগ।

সুভাষ দাবি করেছেন, বিষয়টি নজরে আসার পরে তিনি মুকেশের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কোনও উত্তর না পেয়ে চিঠিও লেখেন। তাঁর কথায়, “মুকেশজি, আমার এবং আমার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভুল প্রচার বন্ধ করুন। জি একটি গোষ্ঠীভুক্ত সংস্থা; সেখানে এখন আমার ব্যক্তিগত মালিকানা বলতে কিছু নেই।” সংবাদমাধ্যমগুলিকে ‘সঠিক তথ্য’ প্রকাশ করার এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘বাছাই করা অভিযান’ বন্ধ করার অনুরোধও জানান তিনি।

এর পরেই পাল্টা বিবৃতি দেয় রিলায়্যান্স। সংস্থার মুখপাত্র বলেন, “এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান শ্রী সুভাষ চন্দ্রের ভিত্তিহীন মন্তব্যে রিলায়্যান্স গোষ্ঠী হতাশ। রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও ইঙ্গিত আমরা দৃঢ় ভাবে অস্বীকার করছি।” রিলায়্যান্সের দাবি, তাদের সংবাদমাধ্যম কখনও কোনও ব্যক্তিকে আক্রমণের কাজে ব্যবহৃত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। একই সঙ্গে সুভাষকে বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোগী হিসাবে শ্রদ্ধা করার কথাও জানিয়েছে সংস্থা। তবে সংশ্লিষ্ট সংবাদ পরিবেশনের তথ্যগত যথার্থতা নিয়ে রিলায়্যান্সের বিবৃতিতে পৃথক কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনালের দিল্লি শাখার ২৫ আগস্টের নির্দেশ। ট্রাইব্যুনাল সুভাষের ব্যক্তিগত দেউলিয়া নিষ্পত্তি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। সেই পরিকল্পনায় ঋণদাতাদের জন্য ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা এবং দেউলিয়া নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার খরচ বাবদ ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অথচ প্রক্রিয়ায় গৃহীত মোট দাবির অঙ্ক ২২,০০৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা। সোজা অঙ্কে উদ্ধার মাত্র ০.০৩ শতাংশ—যা প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ ক্ষতি বা ‘হেয়ারকাট’ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সুভাষের কার্যালয়ের পাল্টা দাবি, পরিকল্পনার বিরোধিতাকারী ঋণদাতাদের প্রকৃত দাবি ৩,৯৯২ কোটি টাকা, ২২ হাজার কোটি নয়। তার মধ্যে ৬২০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই মিটেছে এবং ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলি আরও ১,০৬৩ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে। তাদের দাবি, যে সংস্থাগুলির ঋণের জন্য সুভাষ জামিন দিয়েছিলেন, তারা ইতিমধ্যেই মোট প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ব্যক্তিগত জামিনদারের নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও মূল ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলির দায় স্বয়ংক্রিয় ভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে না।

এই দেউলিয়া মামলার সূত্রপাত ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফিনান্সের আবেদনে। বিবেক ইনফ্রাকন প্রাইভেট লিমিটেডকে দেওয়া ১৭০ কোটি টাকার ঋণে সুভাষ ব্যক্তিগত জামিন দিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পরে তাঁর বিরুদ্ধে প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঋণদাতাদের ভোটে পরিকল্পনাটি প্রদত্ত ভোটের ৮০.৮১ শতাংশ সমর্থন পায়। তবে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, এলআইসি হাউজিং ফিনান্স, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, কানাড়া ব্যাঙ্ক এবং ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক-সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এর বিরোধিতা করেছে। কয়েকটি ঋণদাতা সংস্থা আপিল ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

সুভাষ আরও অভিযোগ করেছেন, ২০১৯ সালে জি-র শেয়ারের দাম এক দিনে প্রায় ৪০ শতাংশ পড়ে যাওয়ার পিছনে মুকেশ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল। পরে বিনিয়োগকারী সংস্থা ইনভেসকোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে রিলায়্যান্স অন্যায় ভাবে জি অধিগ্রহণের চেষ্টা করেছিল বলেও তাঁর দাবি। রিলায়্যান্স এই সমস্ত অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে একটি দেউলিয়া মামলার হিসাব ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন দেশের দুই প্রভাবশালী শিল্পপতির প্রকাশ্য সংঘাতে পরিণত হয়েছে।