নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭৫০-এ পৌঁছেছে। এখনও নিখোঁজ তিন হাজারের বেশি মানুষ। এদিকে নদীতে জলপ্রবাহ আবার বেড়ে যাওয়ায় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলিকে সতর্ক করে দিয়েছে প্রশাসন।

রবিবার চিনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিব্বতে এখনও পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে নেপাল সরকার ৭৩৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সে দেশে নিখোঁজ ২,৪৯৮ জন।

চিনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে রয়েছেন নেপালের ১০৪ জন, ভারতের ৪৯ জন, লাটভিয়ার ৩৩ জন, আমেরিকার ১৮ জন এবং ব্রিটেনের ১৫ জন নাগরিক।

নেপালে এখনও পর্যন্ত ৩,৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।

শনিবার গভীর রাতে উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পায় নেপালি সেনাবাহিনী। ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে সেনারা একটি নল ঢোকাতে সক্ষম হয়। ওই সুড়ঙ্গের ভিতরে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আটকে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং বলেছেন, “ছোট ওই ছিদ্র দিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই ভিতরে বাতাস পাঠাতে শুরু করেছি। এবার খননকাজ শুরু হবে এবং উদ্ধারকারী দলকে সুড়ঙ্গের ভিতরে পাঠানো হবে।”

এ ধরনের একাধিক সুড়ঙ্গে শতাধিক শ্রমিক এখনও জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত ত্রিশূলী ৩এ এবং ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলিকে কেন্দ্র করেই উদ্ধার অভিযান চলছে।

ভোটেকোশীতে ফের বাড়ছে জল

রবিবার নেপাল সরকার নদীর জলস্তর ফের বৃদ্ধির সতর্কতা জারি করে। উদ্ধারকারী দলগুলিকেও অত্যন্ত সাবধানে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেশটির জাতীয় বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সকাল ৭টা ২০ মিনিটে প্রকাশিত সতর্কবার্তায় জানায়, “রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে বন্যার জলপ্রবাহ আরও বেড়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি।”

বিপর্যস্ত এলাকাটিতে বহু বৃহৎ জলবিদ্যুৎ ও শক্তি পরিকাঠামো রয়েছে। নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের তালিকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন শ্রমিক রয়েছেন। এ ছাড়াও তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রী এবং পর্বতারোহীরাও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল শনিবার বলেন, দেশ পুনর্গঠনের জন্য কয়েকশো কোটি ডলার খরচ হতে পারে।

তাঁর কথায়, “এই মুহূর্তে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হচ্ছে উদ্ধার অভিযান এবং যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে।”

বিশেষ ধরনের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি। ভারী বস্তু বহনে সক্ষম ড্রোন এবং ধ্বংসস্তূপ বা সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকা মানুষকে চিহ্নিত করার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চেয়েছে নেপাল।

উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলি শনাক্ত করতে ফরেনসিক পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং সেগুলি সংরক্ষণের জন্য হিমঘরের ব্যবস্থাও চেয়েছেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘ সময় জলে থাকার কারণে মৃতদেহ দ্রুত পচতে শুরু করতে পারে।

‘নদীর ধারের সব জনপদ ভেসে গিয়েছে’

বেঁচে ফেরা মানুষদের সামনে এখন প্রিয়জনদের ভাগ্য জানার যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষা। একই সঙ্গে প্রায় শূন্য থেকে জীবন পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের।

নেপালের নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা বুদ্ধি রাম ডাঙ্গোল বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “নদীর ধারের সমস্ত জনপদ ভেসে গিয়েছে। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।”

আরও একটি বড় বন্যার আশঙ্কা নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধারের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। বরফ, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোতের ফলে বিভিন্ন স্থানে বিশাল জলাধার তৈরি হয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি অস্থায়ী হ্রদ থেকে নতুন করে বিপর্যয়কর বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শনিবার চিন ও নেপালের বিদেশমন্ত্রীদের মধ্যে কথা হয়। উপগ্রহচিত্র এবং নদীর জলপ্রবাহ সংক্রান্ত তথ্য পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া নিয়ে দু’দেশ আলোচনা করেছে বলে জানানো হয়েছে।

তিব্বতে বিপর্যয়ের তথ্যের একমাত্র সরকারি উৎস চিনা কর্তৃপক্ষ। নতুন করে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে ফের বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

চিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছে, গিরংয়ের কাছে মোট ২,১৪১ জন উদ্ধারকারী মোতায়েন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচশোর বেশি উদ্ধারকারী সবচেয়ে বিধ্বস্ত এলাকায় কাজ করছেন।

হাসপাতালের বাইরে স্বজনহারা মানুষের ভিড়

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান সরকারি হাসপাতালের বাইরে সকাল থেকেই নিখোঁজ মানুষের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা জড়ো হচ্ছেন। প্রিয়জনের কোনও খবর পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় তাঁরা একবার সহায়তা কেন্দ্রে যাচ্ছেন, আবার ছুটছেন হাসপাতালের বিজ্ঞপ্তি ফলকের সামনে।

অনেকের হাতে নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি। কেউ আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষের তালিকায় পরিচিত নাম খুঁজছেন, কেউ আবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

দিল মায়া লামা হাসপাতালের সহায়তা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। তাঁর ২৬ বছর বয়সি ভাই নিখোঁজ। তিনি রাসুয়ায় একটি জলবিদ্যুৎ সংস্থার গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। ভাইয়ের সন্ধানে দিল মায়া প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরের রামেছাপ থেকে কাঠমান্ডুতে এসেছেন।

তিনি বলেন, “ভেবেছিলাম, এখানে এলে হয়তো ভাইকে খুঁজে পাব। কিন্তু ওর সম্পর্কে কোনও খবরই নেই।”

নেলজা মোকতানও তাঁর নিখোঁজ তুতো ভাইয়ের সন্ধান করছেন। তিনিও রাসুয়ায় গাড়িচালকের কাজ করতেন।

হতাশ নেলজা বলেন, “কোনও আশা দেখতে পাচ্ছি না। ইতিমধ্যেই চার দিন কেটে গিয়েছে।”

নদীর জল আবার বাড়তে শুরু করায় উদ্ধারকারীদের সামনে এখন দ্বিমুখী লড়াই—একদিকে সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে দ্রুত জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা, অন্যদিকে নতুন বন্যার মুখে উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।