নেপাল–তিব্বতের হড়পা বন্যায় চরম দুর্দশায় অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ

যা জানা জরুরি
- নেপাল–তিব্বত সীমান্তে বুধবারের হড়পা বন্যায় অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে রেড ক্রস।
- এই বিপর্যয়ে ৫৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
- ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চললেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় সেই কাজ বাধা পাচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নেপাল–তিব্বত সীমান্তে বুধবারের হড়পা বন্যায় অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে রেড ক্রস। এই বিপর্যয়ে ৫৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ আরও প্রায় ১,৯০০ জন। ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চললেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় সেই কাজ বাধা পাচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তা সংস্থা, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশন বা আইএফআরসি জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে। প্রবল স্রোতে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় এখনও পৌঁছনো যাচ্ছে না।
শুক্রবার নেপালে আইএফআরসি-র প্রতিনিধিদলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘‘এই ঘটনার মানসিক অভিঘাত বিপুল। হাজার হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে অথবা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের ধারণা, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাঁরা চরম দুর্দশায় রয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই অনেক বেশি। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, তা আরও বাড়তে পারে।’’
হিমবাহ ধসে বিপর্যয়ের সূচনা
বুধবার সকালে হিমালয়ের একটি হিমবাহের বিশাল অংশ ভেঙে নেপালের লাংটাং জাতীয় উদ্যানের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর এই প্রাণঘাতী বন্যার সূত্রপাত। বিপুল পরিমাণ জল, কাদা, পাথর ও বরফের স্রোত নদী ও উপত্যকা বেয়ে গর্জন করতে করতে নেমে আসে। সেই বন্যায় গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধ্বংস হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু।
নেপালের খাড়া পাহাড়ি ঢাল এবং নীচের সবুজ উপত্যকাগুলি এমনিতেই বন্যা ও ধসের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বর্ষণের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং হিমবাহের গলন বেড়েছে।
শুক্রবার নেপালে রাষ্ট্রপুঞ্জের আবাসিক সমন্বয়কারী লিলা পিটার্স ইয়াহিয়া বলেন, ‘‘ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা অবিশ্বাস্য।’’ তিনি জানান, ৪০টিরও বেশি সেতু ধ্বংস হয়েছে অথবা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘‘সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক।’’
সর্বশেষ পরিসংখ্যান
শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৪৩—নেপালে ৫৩৮ জন এবং সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বতে পাঁচ জন। নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তখনও ১,৯৪২ জন নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কয়েকশো বিদেশি নাগরিক। কেউ ওই অঞ্চলে কাজ করতে গিয়েছিলেন, কেউ পথপ্রদর্শক সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ে হাঁটতে, আবার কেউ গিয়েছিলেন তীর্থযাত্রায়।
উদ্ধারকারী দলগুলি জানিয়েছে, বিপর্যয়স্থল থেকে নদীর স্রোত ধরে কয়েকশো মাইল দূরে নেপালের চিতওয়ান জেলাতেও মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য কয়েক ডজন আহতকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে।
নতুন করে বন্যার শঙ্কায় ব্যাহত উদ্ধারকাজ
শুক্রবার ধ্বংসাবশেষ জমে তৈরি একটি বাঁধ উপচে জল বেরোতে শুরু করায় নতুন করে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। সকালে উদ্ধারকাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হন উদ্ধারকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, নদীতে আবার প্রবল স্রোত নামতে পারে, এই আশঙ্কায় তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রাসুয়া জেলার বাসিন্দাদের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের দিকে ছুটতে দেখা যায়।
চিনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, ধসে জমে থাকা মাটি-পাথরের স্তূপে বাধা পেয়ে তৈরি একটি হ্রদ শুক্রবার উপচে পড়তে শুরু করে। উদ্ধারকারী দলগুলি যে এলাকার দিকে যাচ্ছিল, সেদিকেই জল নামতে থাকায় কিছু ক্ষণের জন্য অভিযান বন্ধ রাখতে হয়।
সীমান্তের কাছে ওই হ্রদ উপচে পড়ার পর ত্রিশূলী নদীর জল আবার বাড়তে শুরু করে। তার জেরে শুক্রবার সকালে নেপালের বাগমতী প্রদেশের নুয়াকোট জেলার সদর বিদুরেও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। উদ্ধারকর্মীদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। যাঁরা নিজেদের বাড়ির অবশিষ্ট অংশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদেরও অবিলম্বে আবার এলাকা ছেড়ে যেতে বলা হয়।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিদুর
ত্রিশূলী নদীর তীরে একসময় কর্মচঞ্চল শহর ছিল বিদুর। এখন তা ধ্বংসস্তূপ। বুধবার ভোরে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে আসার সময় অধিকাংশ বাড়িই ভেসে যায়। বেঁচে যাওয়া মানুষজন জানিয়েছেন, তাঁদের উপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা কোনওমতে বাড়ি ও গাছ আঁকড়ে ছিলেন।
একটি ব্যাঙ্ক, একটি সরকারি দফতর এবং একটি এটিএম বুথের দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কংক্রিটের কাঠামো—এই অল্প কয়েকটি নির্মাণই তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও সেগুলিও কাদায় ডুবে। আধিকারিকেরা জানান, ওই ভবনগুলির ভিতরে মৃতদেহ রয়েছে। কিন্তু সেগুলি উদ্ধার করতে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কাছেই কাদায় ঢাকা রাস্তায় মানুষজন জড়ো হয়েছিলেন। কেউ হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের নাম ধরে ডাকছিলেন, কেউ খুঁড়ে বার করার চেষ্টা করছিলেন নিজেদের জিনিসপত্রের যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে।
হড়পা বন্যায় বিধ্বস্ত অধিকাংশ এলাকায় তখনও পৌঁছনোর একমাত্র উপায় ছিল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। উদ্ধার অভিযানের বড় অংশের সমন্বয় করা হচ্ছিল বিদুরের সেনাশিবির থেকে। সেখানে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর উদ্ধারকারী ও সামরিক হেলিকপ্টার ওঠানামা করছিল। নিয়ে আসছিল বিপর্যয়ে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত বহু মানুষকে। তাঁদের অনেকেই বলছিলেন, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বন্যা কেড়ে নিয়েছে তাঁদের প্রিয়জন, বাড়িঘর এবং সর্বস্ব।
বিদেশি সাহায্য নিয়ে অস্বস্তি
নেপাল ও তিব্বতের বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় সাহায্য পৌঁছে দিতে তৎপর হয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। তবে নেপাল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। পাহাড়ি অঞ্চলে সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান জটিল হয়ে পড়লেও কাজ চলছে।
শুক্রবার নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, ‘‘সাহায্যের প্রস্তাব আসা স্বাভাবিক। আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলিই তল্লাশি ও উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এ ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’’
কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, ভারত, চিন, আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ নিজেদের তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়ে অভিযানে সাহায্য করার অনুমতি চেয়েছে নেপাল সরকারের কাছে।
জেনিভায় রাষ্ট্রপুঞ্জে নেপালের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত দীনেশ ভট্টরাইয়ের মতে, বিদেশি সহায়তা গ্রহণে সরকারের অনীহার সঙ্গে রাসুয়া জেলা এবং তিব্বতের সঙ্গে তার সীমান্তের সংবেদনশীলতার সম্পর্ক থাকতে পারে।
রয়টার্সকে ভট্টরাই বলেন, ‘‘তাঁরা হয়তো অঞ্চলটির অবস্থানগত সংবেদনশীলতার কথা ভেবে বিদেশি দল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’’
তবে ছেত্রী বলেন, নেপালের নিজস্ব উদ্ধারকারী দলগুলিই অভিযান সামলাচ্ছে। বিদেশি সহায়তা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনও সংবেদনশীলতার সম্পর্ক নেই।
তিব্বতে তথ্যের ঘাটতি
তিব্বতে ধ্বংসের ব্যাপকতা সম্পর্কে চিনের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খুব সামান্য তথ্যই পাওয়া গিয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও তিব্বত চিনের সবচেয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল। বন্যা নিয়ে সেখানে কেবল সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যমের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনই প্রচার করতে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সেখানে মাত্র পাঁচ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। চিনা প্রতিবেদনগুলিতে মূলত উদ্ধার অভিযানের উপরেই জোর দেওয়া হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



