Table of Contents
হাইলাইটস
- রাজ্যের সব মাদ্রাসার ব্লকভিত্তিক ও পুরসভাভিত্তিক সমীক্ষার নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
- ৫ জুলাইয়ের মধ্যে জেলাশাসকদের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
- সরকারের দাবি, মাদ্রাসাগুলির হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহই এই সমীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
- পাশাপাশি কোথাও কোনও অনিয়ম বা বেআইনি কার্যকলাপ চলছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
- সম্প্রতি মাদ্রাসাগুলিতে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের পর এই নতুন পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলিকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের নজরদারি আরও জোরদার হচ্ছে। মাদ্রাসাগুলিতে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এবার রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসার ওপর বিস্তৃত সমীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর সমস্ত জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে ব্লকভিত্তিক এবং পুরসভাভিত্তিক সমীক্ষা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারি নির্দেশে বলা হয়েছে, এই সমীক্ষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং মাদ্রাসাগুলির কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ চিত্র তৈরি করা। একই সঙ্গে কোথাও কোনও অনিয়ম, আইনবহির্ভূত কার্যকলাপ বা অনুমোদনহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
কেন এই সমীক্ষা?
৫ জুন জারি হওয়া নির্দেশে বলা হয়েছে, জেলার অধীনস্থ সমস্ত মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সরকার মনে করছে, বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় মাদ্রাসার সংখ্যা, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা, শিক্ষক-শিক্ষিকার অবস্থা, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে যে তথ্য রয়েছে, তার অনেকটাই পুরনো।
ফলে নতুন করে একটি বিস্তৃত তথ্যভান্ডার তৈরি করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সেই লক্ষ্যেই এই সমীক্ষা।
তবে নির্দেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য “irregularities” বা অনিয়ম এবং “unlawful activities” বা বেআইনি কার্যকলাপও চিহ্নিত করতে হবে।
এই শব্দবন্ধই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে।
কী কী তথ্য সংগ্রহ করা হবে?
সরকারি সূত্রের খবর, সমীক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাটি সরকারি স্বীকৃত কি না, তা যাচাই করা হবে।
দ্বিতীয়ত, সেখানে কতজন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে, কতজন শিক্ষক রয়েছেন এবং তাঁদের নিয়োগের অবস্থা কী, তা খতিয়ে দেখা হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন, আর্থিক উৎস, পরিচালন সমিতি এবং শিক্ষার ধরন সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে।
এছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়া চলছে কি না, কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অন্য কোনও কার্যকলাপ পরিচালিত হচ্ছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
‘বন্দে মাতরম্’ বিতর্কের পর নতুন পদক্ষেপ
এই সমীক্ষার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়।
গত ১৯ মে রাজ্য সরকার মাদ্রাসাগুলিতে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেয়। সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু মহলের একাংশে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সরকারের যুক্তি ছিল, জাতীয় সংহতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।
তার পরপরই মাদ্রাসাগুলির উপর রাজ্যব্যাপী সমীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আরও নিবিড় প্রশাসনিক নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা এবং সংবেদনশীল অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলির তথ্য সংগ্রহকে প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সূত্রের খবর।
কী বলছে সরকার?
সরকারি মহলের বক্তব্য, এই উদ্যোগকে কোনওভাবেই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তাদের দাবি, রাজ্যের স্কুল, কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের মতো মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও সঠিক তথ্যভান্ডার থাকা জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবকাঠামো গঠন এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের জন্য এই তথ্য প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যদি কোথাও প্রশাসনিক অনিয়ম বা আইনের লঙ্ঘন হয়ে থাকে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াও সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা
যদিও এখনও বড় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি, তবু বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিরোধী মহলের একাংশ এই সমীক্ষাকে সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ওপর অতিরিক্ত নজরদারির প্রচেষ্টা বলে ব্যাখ্যা করতে পারে।
অন্যদিকে সরকারপন্থীদের মতে, যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলিও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।
৫ জুলাইয়ের মধ্যে রিপোর্ট
সরকার সমস্ত জেলাশাসককে আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে আগামী এক মাস জুড়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় মাদ্রাসাগুলিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়তে চলেছে।
এই সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ্যে এলে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রকৃত চিত্র, তাদের সংখ্যা, পরিকাঠামো এবং সম্ভাব্য অনিয়ম সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে বোঝা যাবে, রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ কেবল তথ্য সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তার ভিত্তিতে আরও বড় প্রশাসনিক বা নীতিগত পদক্ষেপের পথ খুলে যায়।