বাংলাস্ফিয়ার: মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস বা টিস-এর ক্যাম্পাসে প্রয়াত অধ্যাপক জি এন সাইবাবাকে স্মরণ করে আয়োজিত একটি জমায়েতকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় এক প্রাক্তন ছাত্রকে গ্রেফতার করল মুম্বই পুলিশ। শুক্রবার দায়রা আদালত তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৩০ বছর বয়সি ওই প্রাক্তন ছাত্রকে চেম্বুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে সোমবার পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে টিস-এর দেওনার ক্যাম্পাসে ওই জমায়েতের ঘটনায় মোট ন’জন ছাত্র ও প্রাক্তন ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। শুক্রবার তাঁদের মধ্যে দু’জনের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করেন অতিরিক্ত দায়রা বিচারক ভি বি বোহরা। তাঁদের একজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হলেও অন্যজন এখনও গ্রেফতার হননি।

পুলিশের অভিযোগ, টিস কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ক্যাম্পাসে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক জি এন সাইবাবার স্মরণে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে ২০২০ সাল থেকে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-র মামলায় কারাবন্দি উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের মুক্তির দাবিতেও স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

পুলিশ আরও দাবি করেছে, অভিযুক্ত দু’জনের কাছে ডাউনলোড করা কিছু বই এবং অন্যান্য নথি পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি থেকে ‘মাওবাদী মতাদর্শ’-এর প্রতি তাঁদের আগ্রহের ইঙ্গিত মেলে। যদিও ছাত্রদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এত গুরুতর অভিযোগের সমর্থনে পুলিশের কাছে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রম্বে থানার পুলিশ প্রথমে এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করে। পরে তদন্তভার মুম্বই পুলিশের অপরাধ দমন শাখার হাতে তুলে দেওয়া হয়। টিস-এর এক সহযোগী ডিনের অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা এফআইআর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন ছাত্র দেওনার ক্যাম্পাসে জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের কাছে প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছিল না বলে অভিযোগ।

পুলিশের বক্তব্য, ওই জমায়েতে একটি গাছে সাইবাবার ছবি রাখা হয়েছিল এবং তাঁর লেখা কবিতা পাঠ করা হয়েছিল। অভিযুক্তদের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধর্মীয়, জাতিগত বা সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো, জাতীয় সংহতির পক্ষে ক্ষতিকর বিবৃতি দেওয়া এবং বেআইনি জমায়েত-সহ একাধিক ধারায় মামলা করা হয়।

দুই প্রাক্তন ছাত্রের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করতে গিয়ে বিচারক বোহরা বলেন, জি এন সাইবাবা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোকে বেআইনি কাজ বলা যায় না। কিন্তু আদালতের মতে, অভিযোগ অনুযায়ী ঘটনাটি শুধু সাইবাবাকে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের মুক্তির দাবিতে স্লোগানও দেওয়া হয়েছিল।

আদালত উল্লেখ করে, উমর ও শারজিল ইউএপিএ-র অধীনে মামলার মুখোমুখি এবং তাঁদের জামিনের আবেদন সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করেছে। বিচারকের মন্তব্য, ছাত্রদের দেশের আইনকে সম্মান করা প্রত্যাশিত।

তবে অভিযুক্ত ছাত্রদের দাবি, তাঁরা উমর বা শারজিলের মুক্তির দাবিতে কোনও স্লোগান দেননি, কোনও বক্তৃতাও করেননি। তাঁদের বক্তব্য, টিস কর্তৃপক্ষও এ ধরনের স্লোগান বা বক্তৃতার কোনও প্রমাণ এফআইআরের সঙ্গে দেয়নি।

অভিযুক্তদের আইনজীবী বিজয় হিরেমঠ আদালতে যুক্তি দেন, ওই জমায়েত পূর্বপরিকল্পিত কোনও বড় অনুষ্ঠান ছিল না। সেটি ছিল তাৎক্ষণিক ভাবে কয়েক জনের একত্রিত হয়ে সাইবাবাকে স্মরণ করার কর্মসূচি। সেই কারণেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আগে অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাঁর আরও যুক্তি, কারও কম্পিউটার বা অন্য যন্ত্রে কিছু বই ডাউনলোড করা থাকলেই তাঁকে মাওবাদী মতাদর্শের অনুসারী বলা যায় না। ওই বইগুলি সাধারণ ভাবেই কেনা বা সংগ্রহ করা সম্ভব।

উমর খালিদ এবং শারজিল ইমাম—দু’জনেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লির দাঙ্গার পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের হওয়া ইউএপিএ মামলায় তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি।

অন্য দিকে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক জি এন সাইবাবাকে মাওবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে ২০১৭ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। পোলিওর কারণে ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হুইলচেয়ারের উপর নির্ভরশীল সাইবাবা প্রায় এক দশক কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালে বম্বে হাই কোর্ট তাঁকে অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করে। মুক্তির মাত্র সাত মাস পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

এখন আগাম জামিন খারিজ হওয়া দুই প্রাক্তন ছাত্রের একজন গ্রেফতার হওয়ায় মামলাটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার পর্যন্ত তাঁকে পুলিশি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। অন্য প্রাক্তন ছাত্রকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি।