বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সাম্প্রতিক ‘ককরোচ আন্দোলন’ শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধেই নয়, মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার বিরুদ্ধেও এক বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। মিম, ব্যঙ্গ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং সম্মিলিত প্রতিবাদের মাধ্যমে জেন জেড প্রজন্ম এমন এক বিকল্প তথ্যপ্রবাহ গড়ে তুলেছে, যা বহু মানুষের কাছে টেলিভিশনের প্রচারিত বয়ানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গার্ডিয়ানের নতুন সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ‘দিস ইজ ইন্ডিয়া’-তে সাংবাদিক নিহা মাসিহ লিখেছেন, এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে আজকের তরুণ প্রজন্ম শুধু রাস্তায় নয়, তথ্যযুদ্ধেও নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে জড়ো হওয়া হাজার হাজার তরুণ-তরুণী শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, ন্যায়বিচার এবং দমননীতির অবসানের দাবিতে স্লোগান তোলেন। একই সঙ্গে তাঁদের ক্ষোভের লক্ষ্য ছিল তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’—অর্থাৎ শাসকপন্থী বলে অভিযুক্ত টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম। বহু জায়গায় মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের বিক্ষোভস্থল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, কোথাও কোথাও তাঁদের হেনস্তার ঘটনাও ঘটে।
প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, তাঁরা রাস্তায় যা প্রত্যক্ষ করেছেন এবং টেলিভিশনের পর্দায় যা দেখানো হয়েছে, তার মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। এই বৈপরীত্যের ফলে বহু মানুষ তথ্যের জন্য আরও বেশি নির্ভর করতে শুরু করেন সামাজিক মাধ্যমের ওপর।
২০ জুলাই সংসদ অভিযানের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দায়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছিল প্রধান দাবি। দিল্লিতে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশের পর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গান ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে মানুষ যখন একদিকে ছুটছিলেন, তখন সেই দিক থেকেও গ্যাসের শেল ছোড়া হয়, ফলে তাঁরা কার্যত আটকে পড়েন।
১৭ বছরের আন্দোলনকারী দীক্ষা মিশ্র গার্ডিয়ানকে বলেন, পুলিশের মারধরে বহু বিক্ষোভকারীর মাথা ফেটে যায়, কারও নাক ভেঙে যায়। আন্দোলনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৫০ জন আহত হন।
কিন্তু দেশের বহু টেলিভিশন চ্যানেল এই ঘটনাকে কেবল ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে তুলে ধরে। কোথাও বিক্ষোভকারীদের ‘উস্কানিদাতা’ বা ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে দেখানো হয়, কোথাও পুলিশ আহত হওয়ার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু চ্যানেল বিদেশি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতও তুলে ধরতে চেয়েছিল। আবার প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা এএনআই ওই দিন পুলিশের অভিযানে আহত বিক্ষোভকারীদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কোনও উল্লেখযোগ্য পোস্ট করেনি বলে তথ্য যাচাইকারী সংস্থা অল্ট নিউজ দাবি করেছে।
নিহা মাসিহর মতে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ১২ বছরে ভারতের মূলধারার, বিশেষ করে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির পরিবর্তে বহু চ্যানেল বিরোধী দল, মানবাধিকার কর্মী, সংখ্যালঘু, শিক্ষাবিদ ও সরকারের সমালোচকদের আক্রমণ করাকেই প্রধান আলোচ্য বিষয় করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটেই সাংবাদিক রবীশ কুমারের জনপ্রিয় করা ‘গোদি মিডিয়া’ শব্দবন্ধটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়।
তবে ককরোচ আন্দোলন সেই প্রচলিত ধারাকে উল্টে দিয়েছে। জেন জেড প্রজন্ম তাদের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা, ব্যঙ্গ এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিজেরাই নথিবদ্ধ করেছে।
একটি বহুল প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, মুম্বইয়ে আটক এক তরুণকে এক পুলিশকর্মী মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন। ভিডিওটি ধারণকারী তরুণ ক্যামেরা নিজের দিকে ঘুরিয়ে হাস্যরসের ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া জানায়, পরে আবার পুলিশকর্মীর দিকে ক্যামেরা ফেরায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত করে তদন্তের নির্দেশ দেয় রাজ্য সরকার।
আরও একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পুলিশ ভ্যান চলতে শুরু করার পর এক ব্যক্তি দরজার ছিটকিনি খুলে দেন, ফলে কয়েকজন আটক বিক্ষোভকারী বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
শেষ পর্যন্ত প্রবল জনরোষের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর সরকারের সমর্থক বলেই পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিও টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের সমালোচনায় সরব হন। পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম মানুষের আস্থা হারিয়েছে। তাঁর মতে, সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে জেন জেডকে থামানো সম্ভব নয়, কারণ “সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায় না।”
বর্তমান প্রজন্মের বড় অংশই সংবাদ সংগ্রহের জন্য টেলিভিশনের বদলে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। ফলে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়া তাঁদের কাছে সহজ। ককরোচ আন্দোলনের সময় ‘গোদি মিডিয়া’র বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভ টেলিভিশনের ক্রমহ্রাসমান প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
‘নেভার লগড আউট: হাউ দ্য ইন্টারনেট ক্রিয়েটেড ইন্ডিয়াস জেন জেড’ বইয়ের লেখক রিয়া চোপড়ার মতে, এই পরিবর্তন শুধু তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি জানান, তাঁর এক বন্ধুর প্রবীণ বাবা ইউটিউবে স্বাধীন সাংবাদিক সমদিশ ভাটিয়া এবং তাঁর সহকর্মী পার্থ নৈনওয়ালের প্রায় এক ঘণ্টার ঘটনাস্থলের ভিডিও মন দিয়ে দেখেছেন। কারণ, অনেকের পরিচিত তরুণ-তরুণীরাই এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ফলে ঘটনাটি সম্পর্কে সরাসরি জানতে চাওয়ার আগ্রহ বেড়েছে।
রিয়া চোপড়ার মতে, এটি ভারতের সংবাদমাধ্যমের জন্য আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের ঝোঁক এখন ধীরে ধীরে স্বাধীন সাংবাদিক, নাগরিক প্রতিবেদক এবং ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি তথ্য তুলে ধরা নির্মাতাদের দিকে বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা যদি আরও বেশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতিবেদন তুলে ধরতে পারেন, তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একচেটিয়া প্রভাব আরও কমে যেতে পারে।