বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১১ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় প্রধান অভিযুক্তের পুলিশি ‘এনকাউন্টার’-এর ঘটনায় কড়া নজর দিল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে ওই এনকাউন্টার সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্ত এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তার জবাবেই আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়, যাতে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়। তবে এই ঘটনার সমস্ত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে চায় আদালত।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এই মামলায় একাদশবর্ষীয় কিশোরীর দেহ একটি বস্তাবন্দি অবস্থায় পুকুর থেকে উদ্ধার হয়। অভিযোগ, তাকে অপহরণের পর গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। তদন্তে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে মূল অভিযুক্ত প্রবাশ মণ্ডলকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় এই এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটে।

পুলিশের বয়ান অনুযায়ী, গভীর রাতে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার পর অভিযুক্ত এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে গুলি চালায় এবং পালানোর চেষ্টা করে। এরপর পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার পর থেকেই মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবীদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি, ঘটনাস্থল পুনর্নির্মাণের কাজ কেন গভীর রাতে করা হল, নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না এবং পুলিশি পদক্ষেপ আদৌ নিয়ম মেনে হয়েছে কি না—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এই প্রেক্ষিতেই হাই কোর্ট পুলিশের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চেয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রিপোর্টে অভিযুক্তকে কোথায়, কখন এবং কী উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা কী ছিল, কীভাবে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটল এবং কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। আদালত মূলত জানতে চাইছে, পুলিশের পদক্ষেপ আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারেই হয়েছে কি না।

বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে এক নিরপরাধ যুবক গণপিটুনিতে নিহত হন বলেও তদন্তে উঠে আসে। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশি তদন্তে সম্ভাব্য গাফিলতির বিষয়েও রিপোর্ট চেয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এদিকে অভিযুক্তের মৃত্যুর পরেও মূল ধর্ষণ-খুন মামলার তদন্ত থেমে নেই। পুলিশের দাবি, ফরেনসিক প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলবে। কারণ কোনও অভিযুক্তের মৃত্যু হলেও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই এগোতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশি এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে আদালতের এই ধরনের রিপোর্ট তলব অস্বাভাবিক নয়। কোনও অভিযুক্তের হেফাজতে মৃত্যু বা পুলিশি গুলিতে মৃত্যু হলে আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার পক্ষে ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এর উদ্দেশ্য পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা নয়, বরং ঘটনাটি আইনসঙ্গত ছিল কি না তা নিশ্চিত করা।

এখন আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরই পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ করবে কলকাতা হাই কোর্ট। ফলে রাজ্যের অন্যতম আলোচিত এই মামলায় বিচারিক নজরদারি আরও জোরদার হল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।