বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তদন্তে বড়সড় পরিবর্তন আনল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই)। চলমান তদন্তের মধ্যে তদন্তকারী অফিসার (আইও) বদল করা হয়েছে এবং বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে মামলার তদন্তে নতুন গতি আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত সিবিআইয়ের তিন সদস্যের এসআইটির দায়িত্ব ছিল অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা যে, মূল অপরাধের পর প্রমাণ নষ্ট করা, তথ্য গোপন করা বা ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার কোনও চেষ্টা হয়েছিল কি না। আদালত বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছিল, ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট রাতে চিকিৎসকের শেষবার দেখা যাওয়া থেকে শুরু করে পরদিন তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত ও দাহ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার ক্রম পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক শুনানিতে হাইকোর্ট তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও তা এখনও যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছয়নি। সমস্ত সংগৃহীত নথি ও তথ্য আদালতের সামনে পেশ করার নির্দেশও দেওয়া হয়। এই প্রেক্ষাপটেই তদন্তকারী অফিসার পরিবর্তন এবং এসআইটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, নতুন তদন্তকারী দল মামলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নতুন করে যাচাই করবে। শুধু মূল অপরাধ নয়, ঘটনার পর হাসপাতাল, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক স্তরে কোনও গাফিলতি বা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় থাকবে। প্রয়োজনে আগের সাক্ষ্য, নথি এবং ফরেনসিক তথ্যও পুনরায় পরীক্ষা করা হতে পারে।
এই মামলায় ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন। তবে নিহত চিকিৎসকের পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন এবং গোটা ষড়যন্ত্রের পূর্ণ সত্য এখনও সামনে আসেনি। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এবং সম্ভাব্য ধামাচাপার অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
এর আগে হাইকোর্ট সিবিআইকে দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায়কে প্রয়োজনে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতিও দেয়। পাশাপাশি নিহত চিকিৎসকের পরিবারের জমা দেওয়া নতুন তথ্য ও নথিও তদন্তে বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালত স্পষ্ট জানায়, প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্ত এগিয়ে নিতে হবে এবং কোনও সম্ভাবনাকেই অগ্রাহ্য করা যাবে না।
আরজি কর কাণ্ড ২০২৪ সালে গোটা দেশকে নাড়া দিয়েছিল। কর্মস্থলে এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক প্রতিবাদে শামিল হন। নারী-নিরাপত্তা, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে। পরে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার কলকাতা পুলিশের হাত থেকে সিবিআইয়ের হাতে যায়।
এখন তদন্তকারী অফিসার পরিবর্তন এবং এসআইটির পুনর্গঠনের ফলে তদন্তে নতুন গতি আসে কি না, সেটাই দেখার। নিহত চিকিৎসকের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। হাইকোর্টও বারবার জানিয়েছে, তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ঘটনার সম্পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন এবং যদি কোনও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র বা প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা হয়ে থাকে, তবে তার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা। আগামী শুনানিতে সিবিআইয়ের পুনর্গঠিত এসআইটির অগ্রগতি রিপোর্টের দিকে নজর থাকবে আদালত, নিহতের পরিবার এবং রাজ্যের মানুষের।