স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, প্রকাশ্যে সিএজি রিপোর্ট

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: চার বছর পর প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হিসাব নিরীক্ষা সংস্থা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)-এর এক প্রতিবেদনে রাজ্যের বহুল প্রচারিত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প ‘স্বাস্থ্যসাথী’ নিয়ে…
- প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সংখ্যা, হাসপাতাল তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া, দাবি নিষ্পত্তি এবং তথ্য যাচাই—সব ক্ষেত্রেই একাধিক অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করেছে সিএজি।
- এই প্রতিবেদন সম্প্রতি বিধানসভায় পেশ হওয়া ২৮টি সিএজি রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: চার বছর পর প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হিসাব নিরীক্ষা সংস্থা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)-এর এক প্রতিবেদনে রাজ্যের বহুল প্রচারিত স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প ‘স্বাস্থ্যসাথী’ নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সংখ্যা, হাসপাতাল তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া, দাবি নিষ্পত্তি এবং তথ্য যাচাই—সব ক্ষেত্রেই একাধিক অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করেছে সিএজি। এই প্রতিবেদন সম্প্রতি বিধানসভায় পেশ হওয়া ২৮টি সিএজি রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে নথিভুক্ত পরিবারের সংখ্যা রাজ্যের রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সিএজি-র মতে, এই অস্বাভাবিক ব্যবধানের কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা সরকার দিতে পারেনি। ফলে প্রকৃত উপভোক্তার সংখ্যা, তথ্যভাণ্ডারের নির্ভুলতা এবং সম্ভাব্য পুনরাবৃত্ত নথিভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রেশন কার্ডের তুলনায় বেশি পরিবার কেন?
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে পরিবারভিত্তিক স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নগদহীন চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হয়। অথচ সিএজি লক্ষ্য করেছে, প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সংখ্যা খাদ্য দফতরের রেশন কার্ডভিত্তিক পরিবারের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
নিরীক্ষকদের মতে, রাজ্য সরকারের কাছে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য বা বিশ্লেষণ নেই, যা এই ব্যবধানের কারণ স্পষ্ট করে। এতে প্রশ্ন উঠছে, একই পরিবার একাধিকবার তালিকাভুক্ত হয়েছে কি না, মৃত বা স্থানান্তরিত পরিবারের তথ্য বাদ পড়েছে কি না, অথবা তথ্য হালনাগাদে ঘাটতি রয়েছে কি না।
হাসপাতাল তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় হাসপাতাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম সবসময় মানা হয়নি। কোথাও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো যাচাই ছাড়াই হাসপাতালকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও নির্ধারিত সময়ে পরিদর্শন বা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।
সিএজি-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এতে পরিষেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নিরীক্ষা আরও বলছে, তালিকাভুক্ত হাসপাতালগুলির উপর নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থাও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না।
দাবি নিষ্পত্তি ও নজরদারিতে ঘাটতি
রিপোর্টে বিমা দাবির নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াতেও একাধিক দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। কোন হাসপাতাল কত দাবি করছে, অস্বাভাবিক হারে কোনও বিশেষ চিকিৎসার বিল জমা পড়ছে কি না, বা সম্ভাব্য জালিয়াতি চিহ্নিত করার জন্য যে তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তা যথাযথভাবে করা হয়নি বলে মন্তব্য করেছে সিএজি।
এর ফলে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরঞ্জিত দাবি সরকারি কোষাগারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার অভিযোগ
স্বাস্থ্যসাথীর উপভোক্তাদের তথ্য নিয়মিত সংশোধন ও হালনাগাদের ক্ষেত্রেও ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, মৃত ব্যক্তি, স্থানান্তরিত পরিবার বা অন্য সরকারি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির মতো পরিবর্তনগুলি সময়মতো প্রতিফলিত না হলে প্রকল্পের প্রকৃত উপভোক্তার সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
সিএজি বলেছে, একটি এত বড় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে আর্থিক পরিকল্পনা এবং পরিষেবা বণ্টন—দু’টিই প্রভাবিত হতে পারে।
সরকারের ব্যাখ্যা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ্য সরকার কিছু ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণের জবাব দিয়েছে। সরকারের দাবি, স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় এমন কিছু পরিবারও রয়েছে, যারা রেশন ব্যবস্থার বাইরে থাকলেও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাচ্ছেন। তবে সিএজি জানিয়েছে, এই ব্যাখ্যা সংখ্যাগত ব্যবধান পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে যথেষ্ট নয়।
এছাড়া হাসপাতাল তালিকাভুক্তি এবং তথ্য যাচাই সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে সরকার ভবিষ্যতে প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
চার বছর পর প্রকাশ্যে সিএজি রিপোর্ট
এই প্রতিবেদন প্রকাশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পশ্চিমবঙ্গে চার বছর ধরে সিএজি-র রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর একসঙ্গে একাধিক নিরীক্ষা রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অন্যতম প্রধান জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত। কোটি কোটি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় নগদহীন চিকিৎসার সুবিধা পেয়েছেন বলে সরকার বারবার দাবি করেছে। সেই প্রকল্প নিয়েই সিএজি-র এই প্রশ্ন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
কী কী সুপারিশ করেছে সিএজি
প্রতিবেদনে সিএজি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও করেছে—
- স্বাস্থ্যসাথীর উপভোক্তা তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
- রেশন কার্ড ও অন্যান্য সরকারি তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে প্রকৃত উপভোক্তা যাচাই করতে হবে।
- হাসপাতাল তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
- দাবি নিষ্পত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
- সম্ভাব্য জালিয়াতি রোধে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, সিএজি-র মূল্যায়ন বলছে, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের উদ্দেশ্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়নে তথ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা জরুরি। চার বছর পর প্রকাশিত এই নিরীক্ষা রিপোর্ট রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্য প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



