বাংলাস্ফিয়ার: ভারত-আমেরিকা সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে আন্দোলনের পথে নামলেন পঞ্জাবের কৃষকরা। বুধবার দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা ‘কিসান মহাপঞ্চায়েত’-এ যোগ দিতে পঞ্জাব থেকে রওনা হওয়া কৃষকদের হরিয়ানার শম্ভু সীমান্তে আটকে দেয় পুলিশ। সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা, ব্যারিকেড, কংক্রিটের ব্লক এবং বিপুল পুলিশ মোতায়েন করে দিল্লিমুখী কৃষকদের অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়া হয়।
কৃষক সংগঠনগুলির অভিযোগ, সরকার আলোচনার পরিবর্তে আবারও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। তাঁদের দাবি, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তিতে কৃষিক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশের কৃষক, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই কৃষকদের মতামত না নিয়ে কোনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি করা চলবে না।
কৃষক নেতাদের বক্তব্য, আমেরিকার কৃষি ব্যবস্থা অত্যন্ত ভর্তুকিনির্ভর। সেখানে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ভারতের বাজারে সহজে প্রবেশের সুযোগ পেলে দেশীয় কৃষকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। গম, ভুট্টা, ডাল, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। এর ফলে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ব্যবস্থাও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সংগঠনগুলির দাবি, কৃষি ও দুগ্ধ খাতকে বাণিজ্যচুক্তির বাইরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। তাঁদের অভিযোগ, কৃষকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সরকার কোনও পরামর্শ করেনি।
দিল্লিতে মহাপঞ্চায়েতের উদ্দেশে রওনা হওয়া বহু কৃষককে শম্ভু সীমান্তেই থামিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সীমান্তে বহুস্তরীয় ব্যারিকেড, কাঁটাতার এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কৃষকদের দিল্লির দিকে এগোতে দেওয়া হয়নি।
পুলিশি বাধার মুখে কৃষক নেতারা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের মতে, সরকারের উচিত ছিল তাঁদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা, সীমান্ত সিল করে দেওয়া নয়।
এদিকে প্রশাসনের দাবি, অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দিল্লির দিকে বড় জমায়েত এগোলে যান চলাচল ও আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেই সীমান্তে কড়াকড়ি করা হয়েছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
কৃষক সংগঠনগুলির বক্তব্য, এই আন্দোলন কেবল একটি বাণিজ্যচুক্তির বিরোধিতা নয়; দেশের কৃষি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। তাঁদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নামে যদি কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকদের আয়ের উপর।
মহাপঞ্চায়েতে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, ভারত কৃষিতে স্বনির্ভরতা বজায় রাখতে চাইলে কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি কৃষিপণ্যের জন্য বাজার খুলে দেওয়ার আগে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সংসদে ও কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হওয়া জরুরি।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য কৃষি-বিষয়ক ছাড়কে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে কৃষকদের এই প্রতিবাদ আগামী দিনে আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষক সংগঠনগুলি স্পষ্ট জানিয়েছে, সরকারের কাছ থেকে সন্তোষজনক আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।