পুজোর পাস তদন্তে মমতাকে ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানোর দাবি ইডির, ‘রয়্যালটি’ বলছেন ইন্দ্রনীল

যা জানা জরুরি
- দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ এবং বিশেষ পাস বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে এবার সামনে এল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর তথ্য।
- এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের দাবি, প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন অক্টেভ রেকর্ডস থেকে মমতাকে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল।
- বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ এবং বিশেষ পাস বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে এবার সামনে এল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর তথ্য। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের দাবি, প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন অক্টেভ রেকর্ডস থেকে মমতাকে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এই তথ্য প্রকাশ করেছে। ইডি জানিয়েছে, ইন্দ্রনীলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ওই অর্থ দেওয়া হয়েছিল রয়্যালটি বাবদ।
ইডির বিবৃতি অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর এবং অক্টেভ রেকর্ডসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার বেশি জমা পড়েছিল। পাশাপাশি সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মমতাকে পাঠানো ৩০ লক্ষ টাকার লেনদেনকে ওই বিবৃতিতে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করেনি ইডি। ফলে অর্থ পাঠানোর তথ্য এবং পুজোর পাসের টাকা আত্মসাতের অভিযোগকে একই সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে মহানির্বাণ রোড মাস আর্ট সোসাইটি, সংক্ষেপে ম্যাসআর্ট। ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দা সেন এই সংগঠনের সভাপতি। দুর্গাপুজোর আগে নির্বাচিত মণ্ডপে প্রতিমা ও শিল্পসজ্জা দেখানোর জন্য ‘প্রিভিউ শো’ আয়োজন করত সংস্থাটি। বৌবাজার থানায় দায়ের হওয়া একটি এফআইআরের ভিত্তিতে অর্থ পাচারের তদন্ত শুরু করেছে ইডি। মূল অভিযোগ, ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতার দাবি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ইডির অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এইভাবে সংগৃহীত অর্থ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির নাম, পরিচিতি এবং প্রতীক বাণিজ্যিক কাজে অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, কলকাতার ২৪টি পুজোমণ্ডপে প্রিভিউ দেখানোর জন্য ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত দামের টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এক লক্ষের বেশি টিকিট দেওয়া হয় বলে সংস্থার দাবি। সেই আয়ের একাংশ নগদে তুলে নেওয়া অথবা বিবিধ খরচ হিসেবে দেখিয়ে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ তুলেছে ইডি।
তদন্তে সরকারি বরাতের প্রসঙ্গও এসেছে। ইডির দাবি, ইন্দ্রনীল মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন ও সংস্কৃতি দফতরের ৮৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একাধিক বরাত পেয়েছিল ধ্রুবজ্যোতি বসু এবং দীপেশ রায়ের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। দু’জনকে ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। অভিযোগ, বরাত পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলি পরে প্রাক্তন মন্ত্রীর আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রিত সংস্থায় বড় অঙ্কের টাকা পাঠায়। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল নগদ তোলার কথাও জানিয়েছে ইডি।
এই সপ্তাহেই ইন্দ্রনীল এবং তাঁর সহযোগী ও আত্মীয়দের সঙ্গে যুক্ত ১৫টি ঠিকানায় তল্লাশি চালায় কেন্দ্রীয় সংস্থা। পরদিন কলকাতার দফতরে প্রাক্তন মন্ত্রীকে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দফতরে ঢোকা বা বেরোনোর সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি। তল্লাশির পর প্রকাশিত বিবৃতিতেই রয়্যালটির ওই লেনদেনের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।
মমতাপন্থী তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ অবশ্য ইডির বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সত্য বিকৃত করার চেষ্টা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, মমতা দীর্ঘদিন ধরেই বই, গানের কথা ও সুরের জন্য রয়্যালটি পান। ইন্দ্রনীলের প্রতিষ্ঠান তাঁর গান বাজারজাত করে এবং সেই সূত্রেই অর্থ দেয়। কুণালের দাবি, লেনদেন নগদে হয়নি; উৎসে কর কেটে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়েছে। মমতার আয়কর রিটার্নেও সেই আয় দেখানো রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
কুণালের আরও বক্তব্য, কোনও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাজকর্মের সঙ্গে মমতার বৈধ উপার্জনকে জুড়ে দেওয়া যায় না। গান প্রকাশ ও বিপণনের বিনিময়ে গীতিকার বা সুরকারকে রয়্যালটি দেওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই দাবি করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রীর আগাম জামিনের আবেদন কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন। সেই আবেদনের পরবর্তী শুনানি সোমবার হওয়ার কথা।
তৃণমূলের সাকেত গোখলেও তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে বেছে বেছে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় সংস্থার পক্ষপাতের পরিচয় বহন করে।
সব মিলিয়ে তদন্তে পাস বিক্রির আয়, সরকারি বরাত এবং ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের অর্থ লেনদেনের একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। তবে মমতাকে অর্থ পাঠানোর বিষয়টি সামনে আসার পরেও ওই নির্দিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে কথিত অপরাধের যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন ঘোষণা ইডির প্রকাশিত বিবৃতিতে নেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



