রাজ্য

গেরুয়া থেকে সাদা, ফের গেরুয়া: রং-যুদ্ধে জড়াল কলকাতার অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • কলকাতার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক রং-যুদ্ধ।
  • প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারের পাশে থাকা ছোট একটি ঘর প্রথমে গেরুয়া, পরে সাদা এবং তার এক দিনের মধ্যেই ফের গেরুয়া রঙে রাঙানো হয়েছে।
  • প্রায় ২০০ বর্গফুটের ওই ঘরটি এক সময় টিকিট বিক্রির জন্য ব্যবহৃত হত।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

কলকাতার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক রং-যুদ্ধ। প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারের পাশে থাকা ছোট একটি ঘর প্রথমে গেরুয়া, পরে সাদা এবং তার এক দিনের মধ্যেই ফের গেরুয়া রঙে রাঙানো হয়েছে। প্রায় ২০০ বর্গফুটের ওই ঘরটি এক সময় টিকিট বিক্রির জন্য ব্যবহৃত হত। এখন সেখানে বসেন নিরাপত্তারক্ষীরা। কিন্তু ঘরটির দেওয়ালের রংকে কেন্দ্র করেই মুখোমুখি হয়েছে রাজ্যের শাসক বিজেপি এবং বামপন্থী শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশ।

বিতর্কের সূচনা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অ্যাকাডেমির ওই ঘরটিকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, ঘরের দেওয়ালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবিসংবলিত প্রচারপত্রও টাঙানো হয়েছিল। বামপন্থী শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিজগতের বেশ কয়েকজন এই পদক্ষেপকে অ্যাকাডেমির ‘রাজনৈতিক গেরুয়াকরণ’ বলে অভিযোগ করেন।

তাঁদের বক্তব্য, অ্যাকাডেমি কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়। বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে শাসকদলের পছন্দের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার অর্থ তার স্বাতন্ত্র্য এবং নিরপেক্ষতার উপরে হস্তক্ষেপ করা। প্রতিবাদ জানিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব চন্দন সেন-সহ কয়েকজন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা অ্যাকাডেমিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি জানান।

শমীক তখন স্বীকার করেছিলেন, ঘরটিকে গেরুয়া রং করা ঠিক হয়নি। তাঁর বক্তব্য ছিল, সর্বত্র রাজনৈতিক দলের রং চাপিয়ে দেওয়া বিজেপির লক্ষ্য নয়। যাঁরা ওই কাজ করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করা হলে দল ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। প্রতিবাদীদের দাবি, তাঁদের কাছে ১৫ দিন সময় চেয়েছিলেন বিজেপি সভাপতি। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেলেও রং পরিবর্তনের কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

শেষ পর্যন্ত ১১ আগস্ট একদল নাট্যকর্মী ও বামপন্থী সমাজকর্মী অ্যাকাডেমি চত্বরে গিয়ে ঘরটির গেরুয়া রঙের উপর সাদা রং করে দেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সিপিএম নেতা ও প্রাক্তন সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে হেস্টিংস থানার পুলিশও সেখানে মোতায়েন ছিল।

কিন্তু সাদা রং টিকল মাত্র এক দিন। পরের দিন শিবপুরের বিজেপি বিধায়ক, অভিনেতা ও পরিচালক রুদ্রনীল ঘোষের নেতৃত্বে বিজেপি কর্মীরা অ্যাকাডেমিতে পৌঁছন। ‘জয় শ্রীরাম’, ‘ভারতমাতা কি জয়’ এবং ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনির মধ্যে ঘরটি আবার গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়।

রুদ্রনীলের দাবি, তাঁরা নতুন করে দলীয় রং চাপাননি; ঘরটির পুরনো চেহারা ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূল সরকারের আমলেও ঘরটি গেরুয়া ও গাঢ় খয়েরি রঙের ছিল। এক সময় ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসু সেখানে বসতেন এবং দেওয়ালে তৃণমূলের প্রতীকও ছিল। তখন যাঁরা প্রতিবাদ করেননি, তাঁরাই এখন বিজেপির বিরুদ্ধে সংস্কৃতি দখলের অভিযোগ তুলছেন।

তিনি আরও দাবি করেন, বামপন্থী প্রতিনিধিরা শমীক ভট্টাচার্যকে ঘরটির আগের রং সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, শমীক রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশের কথা বলেছিলেন এবং বিজেপি সেই নীতির বিরোধিতা করছে না। কিন্তু ঘরটি ফের সাদা করা হলে বিজেপি আবারও তাকে গেরুয়া করবে।

চন্দন সেন অবশ্য রুদ্রনীলের বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ঘরটি আগে কখনও গেরুয়া ছিল না; তার আদি রং ছিল পোড়ামাটির মতো। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এক কথা বললেও দলের কর্মীরা মাটিতে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করছেন বলে অভিযোগ তাঁর। পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে নাট্যকর্মীরা আবার আলোচনায় বসবেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, তিনি নাট্যকর্মী হিসেবে নয়, একজন উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন। গেরুয়া ত্যাগের প্রতীক—তাকে রাজনৈতিক দখলদারির রঙে পরিণত করে বিজেপিই ওই রঙের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে বলে তাঁর মন্তব্য। চলচ্চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, বলপ্রয়োগ করে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

ঘটনার পরে শমীক ভট্টাচার্যও কিছুটা অবস্থান বদলেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রথমে লাল পতাকা টাঙানো, তার পরে ঘর গেরুয়া করা এবং শেষে সিপিএম নেতাদের গিয়ে সাদা রং করা—সব কিছুরই রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। একটি কাজের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

১৯৩৩ সালে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সংগ্রহে বহু বিশিষ্ট শিল্পীর কাজ রয়েছে। সেখানে রয়েছে প্রদর্শশালা, প্রেক্ষাগৃহ এবং সম্মেলনকক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, চিত্রকলা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই প্রতিষ্ঠান। সেই কারণে একটি ছোট ঘরের রং বদলের ঘটনাও নিছক রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্নে আটকে নেই। বিতর্কটি এখন কার্যত বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক পরিচয় আরোপের বৃহত্তর লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles