বারবিকিউয়ের আগুনে দগ্ধ নববধূ, সিটংয়ের হোমস্টে-মালিকসহ চারজন পুলিশ হেফাজতে

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: দার্জিলিংয়ের সিটংয়ে হোমস্টের বারবিকিউ থেকে আগুন ছড়িয়ে উত্তর দিনাজপুরের এক নববধূ গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
- ধৃতদের মধ্যে হোমস্টের মালিক পবনকুমার আগরওয়াল, তাঁর ছেলে নেহাল আইরান, ব্যবস্থাপক দীপেন লামা এবং নাসিরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন।
- কুর্সিয়ং আদালত তাঁদের চার দিনের পুলিশ হেফাজত দিয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: দার্জিলিংয়ের সিটংয়ে হোমস্টের বারবিকিউ থেকে আগুন ছড়িয়ে উত্তর দিনাজপুরের এক নববধূ গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে হোমস্টের মালিক পবনকুমার আগরওয়াল, তাঁর ছেলে নেহাল আইরান, ব্যবস্থাপক দীপেন লামা এবং নাসিরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি রয়েছেন। কুর্সিয়ং আদালত তাঁদের চার দিনের পুলিশ হেফাজত দিয়েছে। গ্রেপ্তার তদন্তের পদক্ষেপ; অবহেলা বা অন্য অপরাধে কার কী দায়, আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি।
চোপড়ার বাসিন্দা সৌভিক দাস ও তাঁর স্ত্রী নিকিতা ১৩ সেপ্টেম্বর সিটংয়ের হোমস্টেতে ওঠেন। তাঁদের বিয়ে হয়েছিল প্রায় দু’মাস আগে। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বারবিকিউ চলার সময় আগুন বাড়াতে দাহ্য তরল ঢালা হয়। প্রকাশিত দৃশ্য ও প্রত্যক্ষ বর্ণনা অনুযায়ী, মুহূর্তে বড় আগুনের গোলা তৈরি হয়ে নিকিতার গায়ে লাগে। সৌভিক আগুন নেভাতে গিয়ে হাতে দগ্ধ হন। নিকিতার শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ পুড়েছে; শিলিগুড়ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
পুলিশি সূত্রের দাবি, নাসিরুদ্দিন হোমস্টের নিয়মিত কর্মী নন; পরিচিত এক কর্মীর কাছে মাঝে মাঝে যেতেন। তবু তাঁকে অতিথিদের সামনে বারবিকিউ সামলাতে দেওয়া হয়েছিল কেন, সেটিই মালিক ও ব্যবস্থাপকের দায়িত্বের প্রশ্ন তুলেছে। সৌভিকের অভিযোগ, সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা প্রশিক্ষিত জরুরি সহায়তা ছিল না এবং আহতকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর উপযুক্ত পরিবহণও মেলেনি। হোমস্টে কর্তৃপক্ষের পূর্ণ বক্তব্য আদালতে এখনও আসেনি। ইচ্ছাকৃত হামলার প্রমাণও বর্তমান তথ্যে নেই; প্রাথমিক প্রশ্ন অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা।
সিটংসহ পূর্ব হিমালয়ের বহু এলাকায় হোমস্টে গ্রামীণ পর্যটন ও স্থানীয় জীবিকার প্রধান উৎস হয়েছে। ছোট বসতবাড়ির কয়েকটি ঘর অতিথিকে দেওয়ার প্রাথমিক ধারণা এখন বনফায়ার, বারবিকিউ, রান্নাঘর, গাড়ি ও নানা বিনোদন-পরিষেবাসহ ছোট আতিথেয়তা ব্যবসায় বদলেছে। কিন্তু নিবন্ধন, অগ্নিনিরাপত্তা, কর্মীর প্রশিক্ষণ, বিমা এবং নিকটবর্তী চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে সেই গতিতে বাড়েনি।
হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক সব হোমস্টে ও গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্রকে আগুন-সম্পর্কিত পরিষেবায় সর্বোচ্চ সতর্কতা রাখতে বলেছে। বারবিকিউ বা বনফায়ারে জ্বালানি ঢালার নির্দিষ্ট পদ্ধতি, অতিথির নিরাপদ দূরত্ব, অগ্নিনির্বাপক ও আগুন-ঢাকার চাদর, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং আহতকে সরানোর প্রস্তুতি থাকা দরকার। শুধু অতিথিকে একটি দায়মুক্তির কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায় শেষ হয় না।
গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র অনেক সময় দমকলকেন্দ্র ও বড় হাসপাতাল থেকে দূরে থাকে। তাই ন্যূনতম প্রস্তুতির মান শহুরে হোটেলের অনুলিপি হলেই চলবে না; দূরত্বের বাড়তি ঝুঁকি ধরতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিকটতম অ্যাম্বুল্যান্স, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও দমকলের নম্বর দৃশ্যমান রাখা, কর্মীদের প্রাথমিক পোড়া-আঘাত সামলানোর প্রশিক্ষণ এবং অতিথি আসার আগে সরঞ্জাম পরীক্ষা করা প্রয়োজন। দাহ্য তরল খোলা পানীয়ের বোতলে রাখলে ভুল ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে; মূল লেবেলযুক্ত নিরাপদ পাত্র ও নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
বিশ্লেষণ: একটি ভয়াবহ ভিডিয়ো দেখে গোটা হোমস্টে শিল্পকে অনিরাপদ বলা ঠিক নয়। আবার ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন কর্মীর ভুল বলে শেষ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানো হবে। যিনি প্রশিক্ষিত নন তাঁকে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের অনুমতি কে দিলেন, সরঞ্জাম কোথায় রাখা ছিল এবং দুর্ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়ায় কত দেরি হয়েছে—তদন্তে এই ধারাবাহিকতা দেখা প্রয়োজন।
পাহাড়ের হাজার পরিবারের জীবিকা পর্যটনের উপর নির্ভরশীল; নিরাপত্তার মান সেই শিল্পের বিরুদ্ধে বোঝা নয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতার শর্ত। জেলা প্রশাসন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা, জরুরি নম্বর এবং ন্যূনতম অগ্নিসুরক্ষা-পরীক্ষা প্রকাশ করতে পারে। দূরবর্তী গ্রামে অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছতে কত সময় লাগে এবং নিকটতম দগ্ধ-চিকিৎসা কোথায়, সেই তথ্য ঘরে দৃশ্যমান রাখা উচিত। পর্যটকের ভাষায় লেখা সহজ জরুরি নির্দেশও আতঙ্কের সময়ে কাজে আসে। লাইসেন্সহীন বা নিয়মভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে সময়বদ্ধ সংশোধন ও প্রয়োজনে বন্ধের ব্যবস্থা দরকার। সিটংয়ের ঘটনায় ফৌজদারি দায় আদালত বলবে; প্রশাসনের কাজ হল পরের অতিথিকে একই ভুলের পরীক্ষামূলক বিষয় না-বানানো।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



