হাইলাইটস:
- রাষ্ট্রসংঘের প্রতিবেদনে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধচক্রের দ্রুত বিস্তারের চিত্র।
- ম্যালওয়্যার, জেনারেটিভ এআই ও ডিপফেক ব্যবহার করে যৌন চাঁদাবাজি, প্রতারণা ও পরিচয় জালিয়াতি।
- অপরাধী নেটওয়ার্ক এখন এশিয়ার বাইরেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয়।
- প্রযুক্তি সংস্থা, সরকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান রাষ্ট্রসংঘের।
রাষ্ট্রসংঘ সতর্ক করে বলেছে, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে অভূতপূর্ব গতিতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। ম্যালওয়্যার, জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেক, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্যে তারা শুধু আর্থিক প্রতারণাই নয়, যৌন চাঁদাবাজি, পরিচয় জালিয়াতি, মানবপাচার এবং অনলাইন শোষণের মতো অপরাধও বাড়িয়ে তুলছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত রাষ্ট্রসংঘের এই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অপরাধচক্রগুলি এখন প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করছে যে তাদের কার্যকলাপ শনাক্ত করা এবং দমন করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। অপরাধের ভৌগোলিক সীমাও আর এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, জেনারেটিভ এআই এখন অপরাধীদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তারা ভুয়ো ছবি, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বর তৈরি করে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যের ছদ্মবেশে যোগাযোগ করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও বাড়ছে।
রাষ্ট্রসংঘের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হল যৌন চাঁদাবাজি বা ‘সেক্সটরশন’-এর বিস্তার। অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়ো পরিচয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর ডিপফেক বা কৃত্রিমভাবে তৈরি অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ব্ল্যাকমেল করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এমন ছবি সম্পূর্ণ ভুয়ো হলেও ভুক্তভোগীরা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অর্থ দিতে বাধ্য হন।
ম্যালওয়্যারও এই অপরাধ সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে অনুপ্রবেশ, তথ্য চুরি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ দখল এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। অপরাধচক্রগুলি নিজেদের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভাগ করে নিচ্ছে এবং অনলাইনে ‘অপরাধ-পরিষেবা’ বিক্রির বাজারও তৈরি করেছে। ফলে প্রযুক্তিগত জ্ঞান কম থাকলেও অন্য অপরাধীরাও সহজেই এই সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব নেটওয়ার্ক পরিচালনায় এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক (ভিপিএন), ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। এর ফলে অর্থের লেনদেনের উৎস এবং অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা এই অপরাধচক্র এখন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও কার্যক্রম বিস্তার করছে। কোথাও তারা স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বাঁধছে, কোথাও আবার নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলছে। এর ফলে সমস্যাটি আর আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে অনলাইন প্রতারণা পরিচালনাকারী বিশাল কল সেন্টারগুলির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অনেক ক্ষেত্রেই মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জোর করে কাজ করানো হয়। প্রতারণার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই অর্থ আবার নতুন প্রযুক্তি কেনা, নতুন নেটওয়ার্ক গড়া এবং অপরাধের পরিধি বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রসংঘের মতে, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রযুক্তি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকারের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে জেনারেটিভ এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আরও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে সাধারণ মানুষের জন্যও সতর্কবার্তা রয়েছে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ভাগ না করা, সন্দেহজনক ভিডিও বা ফোনকল যাচাই করা, দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের মূল্যায়ন স্পষ্ট—প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবন সহজ করেছে, তেমনি অপরাধচক্রগুলিও সেই প্রযুক্তিকে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নত প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা একসঙ্গে না বাড়ালে এই ডিজিটাল অপরাধ সাম্রাজ্য আগামী দিনে আরও বিস্তৃত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।