আকাশে ৭৭০০, ফিরল লন্ডন

যা জানা জরুরি
- লন্ডন থেকে শিকাগোর পথে উড়েছিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমান।
- কিন্তু আটলান্টিক পেরোনোর আগেই বদলে গেল গন্তব্য।
- আয়ারল্যান্ডের আকাশে জরুরি সংকেত পাঠিয়ে প্রায় ৩৭ হাজার ফুট থেকে দ্রুত নেমে হিথরোর দিকেই ফিরল বিএ২৯৫।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
লন্ডন থেকে শিকাগোর পথে উড়েছিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমান। কিন্তু আটলান্টিক পেরোনোর আগেই বদলে গেল গন্তব্য। আয়ারল্যান্ডের আকাশে জরুরি সংকেত পাঠিয়ে প্রায় ৩৭ হাজার ফুট থেকে দ্রুত নেমে হিথরোর দিকেই ফিরল বিএ২৯৫। কী কারণে এই সিদ্ধান্ত, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সোমবার, ৫ অক্টোবর স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে উড়েছিল বিমানটি। গন্তব্য ছিল শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর বিমানটির নির্ধারিত যাত্রার সময় ছিল প্রায় আট ঘণ্টা ৪০ মিনিট। কিন্তু উড়ানের এক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন বিমানটি আয়ারল্যান্ডের আকাশে। বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বলছে, বিএ২৯৫ থেকে ‘৭৭০০’ জরুরি সংকেত পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে এই কোড সাধারণ জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
এর পরেই বিমানের উচ্চতায় বড় পরিবর্তন নজরে আসে। প্রায় ৩৭ হাজার ফুট থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটি নেমে আসে প্রায় ৯ হাজার ফুটে। অর্থাৎ উচ্চতা কমে প্রায় ২৮ হাজার ফুট। এরপর আমেরিকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার বদলে বিমানটি লন্ডনের হিথরোর দিকে ফেরার পথ ধরে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—বিমানটি ‘৯ হাজার ফুট নেমেছে’, এমন নয়। প্রকাশিত ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮ হাজার ফুট উচ্চতা কমিয়ে সেটি প্রায় ৯ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছয়। তবে এই উচ্চতা পরিবর্তন থেকেই বিমানের ভিতরে ঠিক কী সমস্যা হয়েছিল, তা বলা সম্ভব নয়।
বিমান চলাচল সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম এয়ারলাইভ জানিয়েছে, বিএ২৯৫ হিথরোর টার্মিনাল ৫ থেকে উড়েছিল। বিমানটির নিবন্ধন নম্বর জি-ভিআইআইএ। ভারতীয় সময় বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে উড্ডয়ন করে সেটি। প্রায় এক ঘণ্টা পরেই জরুরি পরিস্থিতির ইঙ্গিত মেলে।
পরে ফ্লাইটরাডার২৪-কে উদ্ধৃত করে মিন্ট জানায়, হিথরোয় ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিমানের জ্বালানির ওজন কমানো হচ্ছিল। প্রাথমিক রিপোর্টে ইংলিশ চ্যানেলের উপর বিমানটির চক্কর দেওয়ার কথাও উঠে আসে। তবে জ্বালানি স্বাভাবিকভাবে পুড়িয়ে ওজন কমানো হচ্ছিল, নাকি বিশেষ ব্যবস্থায় জ্বালানি বাইরে ফেলা হচ্ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
দূরপাল্লার বিমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিকাগোর মতো দীর্ঘ পথের জন্য উড়ানের শুরুতেই বিমানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি থাকে। কিন্তু যাত্রার অল্প সময়ের মধ্যেই যদি বিমানকে ফিরে আসতে হয়, তখন অবতরণের সময় বিমানের ওজন কত থাকবে, রানওয়ের দৈর্ঘ্য এবং বিমানের সামগ্রিক পরিস্থিতি—সবই বিবেচনায় রাখতে হয়।
বোয়িংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে পাইলটরা পরিস্থিতি অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করে ওজন কমাতে পারেন। উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকলে জ্বালানি বাইরে ফেলার ব্যবস্থাও করা যায়। আবার জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে বেশি ওজন নিয়েও অবতরণ করা সম্ভব। কোন পদ্ধতি নেওয়া হবে, তা নির্ভর করে সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির উপর।
তাই জরুরি সংকেত পাঠানোর পরও বিমান কিছু সময় আকাশে চক্কর দিয়েছে বা উড়ে গেছে মানেই বিপদকে হালকা করে দেখা হচ্ছে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
‘৭৭০০’ সংকেত নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে এই কোড পাঠানো হলে বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় সেটিকে সাধারণ জরুরি পরিস্থিতির সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-এর নির্দেশিকাতেও এর উল্লেখ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল, সংশ্লিষ্ট বিমানের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে—এই বার্তাটি দ্রুত নিয়ন্ত্রকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু ‘৭৭০০’ কোনও নির্দিষ্ট সমস্যার নাম নয়। এই কোড দেখেই ইঞ্জিন বিকল, আগুন, বায়ুচাপের সমস্যা বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট বিপদ ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সমস্যার প্রকৃতি জানতে পাইলটদের বার্তা এবং বিমানসংস্থার আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রয়োজন।
বিমানের দ্রুত উচ্চতা কমানোর ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। উঁচুতে ওড়ার সময় কেবিনের বায়ুচাপ বজায় রাখার ব্যবস্থায় সমস্যা হলে পাইলটরা জরুরি পদ্ধতিতে বিমানকে অনেকটা নিচে নামিয়ে আনতে পারেন। এফএএ-র নিরাপত্তা নির্দেশনায় বায়ুচাপ হারানোর পরিস্থিতিতে অক্সিজেন ব্যবহারের পাশাপাশি ভূপ্রকৃতি ও পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে প্রায় ১০ হাজার ফুট বা তার নিচে নামার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিএ২৯৫-এর ক্ষেত্রে বায়ুচাপের সমস্যাই হয়েছিল—এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। একই ভাবে, দ্রুত উচ্চতা কমানোকে ‘নিয়ন্ত্রণহীন পতন’ বলাও ঠিক হবে না। পাইলটের নিয়ন্ত্রিত জরুরি অবতরণ এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে নেমে যাওয়া একেবারেই আলাদা বিষয়। শুধু ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য দেখে সেই পার্থক্য নির্ধারণ করা যায় না।
প্রাথমিক রিপোর্টে বিমানে কত জন যাত্রী ও কর্মী ছিলেন, কেউ অসুস্থ বা আহত হয়েছেন কি না কিংবা যাত্রীদের পরবর্তী যাত্রার কী ব্যবস্থা করা হবে—এসবের বিস্তারিতও জানা যায়নি।
আপাতত নিশ্চিত যা, তা হল—শিকাগোর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই বিএ২৯৫ ‘৭৭০০’ জরুরি সংকেত পাঠায়, উচ্চতা দ্রুত কমায় এবং আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকার দিকে না গিয়ে হিথরোর পথে ফিরে যায়। কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হল, তার উত্তর মিলবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বিবৃতিতেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



