International

লুলার শেষ লড়াই

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার দাবি, চরম দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতায় ফেরার পথে তিনিই প্রধান বাধা।
  • রবিবারের প্রথম দফার ভোটের আগে শুক্রবার রিয়ো দে জেনেইরোর রাস্তায় বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে ৮০ বছরের এই বামপন্থী নেতা বললেন, এ বার লড়াই শুধু…
  • মিছিলের আগের দিন জনপ্রিয় ‘ফ্লো’ পডকাস্টে লুলা বলেন, দক্ষিণপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর পরিবারকে ফের সরকারে আসা থেকে আটকাতেই তিনি ঐতিহাসিক চতুর্থ মেয়াদে লড়ছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার দাবি, চরম দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতায় ফেরার পথে তিনিই প্রধান বাধা। রবিবারের প্রথম দফার ভোটের আগে শুক্রবার রিয়ো দে জেনেইরোর রাস্তায় বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে ৮০ বছরের এই বামপন্থী নেতা বললেন, এ বার লড়াই শুধু একটি নির্বাচনের নয়—ব্রাজিলের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

মিছিলের আগের দিন জনপ্রিয় ‘ফ্লো’ পডকাস্টে লুলা বলেন, দক্ষিণপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর পরিবারকে ফের সরকারে আসা থেকে আটকাতেই তিনি ঐতিহাসিক চতুর্থ মেয়াদে লড়ছেন। তাঁর কথায়, তিনি রুখে না দাঁড়ালে ‘ফ্যাসিবাদীরা’ আরও একটি নির্বাচন জিতে যেত। পরে তাঁর সংক্ষিপ্ত বার্তা—“হয় আমি, নয়তো বর্বরতা।”

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই রিয়োয় পৌঁছে প্রচারের শেষ বড় মিছিল করেন লুলা। স্থানও ছিল প্রতীকী। কান্দেলারিয়া গির্জা থেকে শুরু হয়ে মিছিল এগোয় সিনেলান্দিয়ার দিকে—দুই জায়গাই ব্রাজিলের সামরিক একনায়কতন্ত্রবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে।

১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সালের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় এই দুই জায়গাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৪ সালে কান্দেলারিয়ার কাছে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষের সমাবেশ হয়েছিল। সেই মঞ্চে বক্তাদের মধ্যে ছিলেন তরুণ লুলাও। চার দশক পরে সেই স্মৃতির জায়গাতেই দাঁড়িয়ে তাঁর বার্তা, “এখানে প্রশ্নটা কোনও একজন মানুষের জয়ের নয়। প্রশ্নটা একটি আদর্শের জয়, গণতন্ত্রের জয়।”

কান্দেলারিয়া থেকে লাল পতাকা হাতে লুলা-সমর্থকদের জনস্রোত প্রায় এক মাইল এগিয়ে যায় সিনেলান্দিয়ার দিকে। ১৯৬৮ সালে সেখানেই হয়েছিল ‘এক লক্ষ মানুষের মিছিল’—সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের অন্যতম স্মরণীয় গণতন্ত্রপন্থী প্রতিবাদ।

মিছিল থেকে লুলা আরও বলেন, “কোনও বিদেশি ব্রাজিলের কোনও কিছুতে হাত দিতে পারবে না।” মন্তব্যটির পরোক্ষ নিশানা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। লুলা শিবিরের অভিযোগ, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

এই রাজনৈতিক আবহেই এ বারের ভোটকে ঘিরে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। লুলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। জাইর ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয়ের পর সেই ফল উল্টে দেওয়ার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

লুলা-সমর্থকদের একাংশের আশঙ্কা, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে তাঁর বাবাকে ক্ষমা করার উদ্যোগ নিতে পারেন। প্রচারেই ফ্লাভিও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের যোগাযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফ্লাভিও সুপ্রিম কোর্টে পাঁচ জন রক্ষণশীল বিচারপতি নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।

লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা মার্সেলো ফ্রেইশোর বক্তব্য, এ নির্বাচন তাঁদের প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলির একটি। তাঁর মতে, ২১ বছরের সামরিক একনায়কতন্ত্রের পর ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যে দীর্ঘ লড়াই হয়েছে, বলসোনারো পরিবারের প্রত্যাবর্তন সেই প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

রিয়োর মিছিলে যোগ দেওয়া সাধারণ মানুষের বক্তব্যেও একই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি। ইতিহাসের শিক্ষক ভালমির আলেইশোর কথায়, লড়াইটা গণতন্ত্র বনাম চরম দক্ষিণপন্থার মধ্যে। ৭৪ বছরের নোনি অস্ত্রোয়ার হাতে ছিল নিজের তৈরি ব্যানার—‘গণতন্ত্র মূল্যবান’। নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে আসা পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি বলেন, ব্রাজিলে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন তিনি দেখতে চান না।

তবে বলসোনারো শিবিরের বার্তাও সমান স্পষ্ট। অনলাইনে প্রচারিত বক্তব্যে ফ্লাভিও বলেন, ব্রাজিলের মানুষ আগামী কয়েক ঘণ্টায় আগামী ৩০, ৪০ কিংবা ৫০ বছরের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে চলেছেন। তাঁর দাবি, ওয়ার্কার্স পার্টির যুগের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে।

ভোটের আগের সমীক্ষাতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার টানটান ছবি দেখা যাচ্ছে। ২ অক্টোবর প্রকাশিত Datafolha-র হিসাবে, প্রথম দফায় বৈধ ভোটের হিসাবে লুলার সমর্থন ৪৫ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর ৪০ শতাংশ। তবে এই ব্যবধানকে নিশ্চিত ফল হিসেবে দেখা যায় না—সমীক্ষাটির মার্জিন অব এরর দুই শতাংশ পয়েন্ট এবং ১৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁরা এখনও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার হিসাবেও লুলা ৪৮ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৪৫ শতাংশে রয়েছেন, যা সমীক্ষার ত্রুটিসীমার মধ্যে পড়ে।

অর্থাৎ ভোটের অঙ্কে কোনও নিশ্চিত ফলের ছবি নেই। প্রথম দফায় কেউ বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় লড়াই হওয়ার কথা।

আর সেই কারণেই রিয়োর মিছিল শুধু শেষ মুহূর্তের প্রচারসভা ছিল না। লুলা নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, সামরিক একনায়কতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন—তিনটিকেই এক সুতোয় বাঁধলেন। অন্য দিকে বলসোনারো শিবির তুলে ধরল পরিবর্তন ও পুরনো রাজনৈতিক যুগের অবসানের বার্তা।

রবিবারের ভোটে সেই দুই বয়ানের মধ্যে কোনটি বেশি সমর্থন পায়, তার প্রথম উত্তর মিলবে ব্যালটেই। আপাতত ব্রাজিলের রাস্তায় শেষ মুহূর্তের লড়াইটা শুধু দুই প্রার্থীর নয়—দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দাবিরও।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles