ফের ইরানে মার্কিন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন

যা জানা জরুরি
- কয়েক দিনের আপাত শান্তির পর ফের ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
- জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘অত্যন্ত কঠোর’ পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তার পরেই এই অভিযান।
- নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কয়েক দিনের আপাত শান্তির পর ফের ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ‘অত্যন্ত কঠোর’ পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তার পরেই এই অভিযান। নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা অবকাঠামো।
অন্যদিকে, ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত দ্বীপ কেশমে হামলায় অন্তত দু’জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
একের পর এক ফ্রন্টে সংঘর্ষ
মার্কিন হামলার মাত্র এক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছিল। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই অভিযানে অন্তত ২০ জন যোদ্ধা এবং ইরানের ছয় জন সামরিক উপদেষ্টা নিহত হন।
ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF) জানিয়েছে, রাতের হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন। ইরানের মার্কাজি প্রদেশের এক শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকের দাবি, নিহতদের মধ্যে তেহরানের চার জন সামরিক উপদেষ্টাও ছিলেন।
২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় গড়ে ওঠে এই মিলিশিয়া জোট। পরে ইরাক সরকার তাদের সশস্ত্র বাহিনীর একটি স্বাধীন সামরিক কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে জোটের বিভিন্ন গোষ্ঠী বাস্তবে নিজেদের মতো করে কাজ করে এবং অতীতে মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে।
মিশরেও আগুন, বাড়ছে উদ্বেগ
নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরেও। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রের দাবি, ড্রোন হামলায় একটি মার্কিন মালিকানাধীন ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং গ্রিক মালিকানাধীন একটি ট্যাঙ্কারে আগুন ধরে যায়।
তবে এই হামলার দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি। কোনও হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এই হামলা ‘আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি’। একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, “এবার ওদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করা হবে। এবার পালা আমাদের।”
ভেস্তে যাচ্ছে কূটনীতির চেষ্টা?
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের আগে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানকে ফের আলোচনার টেবিলে ফেরানোর ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই উদ্যোগ বড় ধাক্কা খেয়েছে।
তবে এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার দাবি, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ফের জাগিয়ে তুলতে এখনও দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দিনের বিরতির পর একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি এখন ‘অজানা ও অত্যন্ত বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাত থামানো যে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আরও আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলির নিরাপত্তাতেও পড়তে পারে।
তেলের বাজারেও যুদ্ধের আঁচ
নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও লাফিয়ে বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭.৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলারেরও বেশি হয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নতুন হুমকি। সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধের ঘোষণা করেছে। ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সোমবার হুথিরা দাবি করে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরমুখী তেল পরিবহণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তারা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি ড্রোন প্রবেশের জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ফলে সংঘাতের আঁচ এখন শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ থেকে লোহিত সাগর, ইরাক থেকে ইয়েমেন—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এখন বড় প্রশ্ন, এই সংঘাত কি ফের কূটনীতির টেবিলে ফিরবে, নাকি আরও বড় যুদ্ধের দিকে এগোবে গোটা অঞ্চল?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



