Home International ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সংস্থার তেল-তৎপরতা, গ্রিনল্যান্ডের কড়া বার্তা: ‘আগে অনুমতি, পরে খনন’

ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সংস্থার তেল-তৎপরতা, গ্রিনল্যান্ডের কড়া বার্তা: ‘আগে অনুমতি, পরে খনন’

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
15 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ফের গ্রিনল্যান্ডের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হুমকি দিচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ই আর্কটিকের এই ভূখণ্ডে তেল অনুসন্ধানের তোড়জোড় শুরু করেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি মার্কিন সংস্থা। কিন্তু বিপত্তি হল, স্থানীয় সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমতি এখনও মেলেনি। অনুমতি ছাড়াই তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম নামানোর ঘটনায় তাই সংস্থাটিকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড সরকার।

টেক্সাসের সংস্থা গ্রিনল্যান্ড এনার্জি-র জন্ম গত বছর। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে তেল অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়েছে তারা। কিন্তু ওই সরঞ্জাম পরিবহণের আগে গ্রিনল্যান্ড সরকারের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

সরকারের স্পষ্ট বার্তা—ভবিষ্যতে এ ধরনের যাবতীয় পরিবহণ ও সরবরাহের আগে খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ, অনুমতি হাতে আসার আগেই তেল অনুসন্ধানের পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা যে তাদের পছন্দ হয়নি, তা বুঝিয়ে দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড।

তেলের আগে ট্রাম্প

ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক গ্রিনল্যান্ড-নীতি ঘিরে। গ্রিনল্যান্ড সরকারের সতর্কবার্তার মাত্র দু’দিন পর ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একটি ছবি পোস্ট করেন। সেখানে তাঁকে একটি গ্রিনল্যান্ডের গ্রামের উপর বিশাল আকৃতিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবির সঙ্গে লেখা ছিল, ‘হ্যালো গ্রিনল্যান্ড’

এই পরিস্থিতিতে তেল অনুসন্ধানের উদ্যোগটি নিছক বাণিজ্যিক প্রকল্প, নাকি এর পিছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

মাটির নীচে ‘ট্রিলিয়ন’?

গ্রিনল্যান্ড এনার্জির দাবি, গ্রিনল্যান্ডের জেমসন ল্যান্ড অঞ্চলের মাটির নীচে প্রায় এক লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেল থাকতে পারে। সেই সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রাথমিক ভাবে প্রায় ৬ কোটি ডলার খরচ করে দু’টি পরীক্ষামূলক কূপ খননের পরিকল্পনা করেছিল সংস্থাটি।

তবে পথে বড়সড় আইনি ও পরিবেশগত বাধা রয়েছে।

পরিবেশ রক্ষার কারণ দেখিয়ে ২০২১ সালেই গ্রিনল্যান্ড সরকার নতুন তেল অনুসন্ধানের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়। যদিও তার আগে ব্রিটেনের ৮০ মাইল নামে একটি সংস্থা জেমসন ল্যান্ডে অনুসন্ধানের অধিকার পেয়েছিল।

গ্রিনল্যান্ড এনার্জির নথি অনুযায়ী, অনুসন্ধানের যাবতীয় খরচ বহনের বিনিময়ে ওই প্রকল্পের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদার হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। কিন্তু খনন শুরু করতে হলে গ্রিনল্যান্ড সরকারের অনুমোদন এখনও অপরিহার্য।

তার উপর, প্রস্তাবিত কূপগুলির এলাকার অন্তত কিছু অংশ জলাভূমি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক রামসার কনভেনশন-এর আওতায় থাকা সুরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে পড়তে পারে।

প্রকল্পে ‘ডক্টর ফিল’

তেল প্রকল্পটির সঙ্গে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মহলের যোগাযোগের বিষয়টিও নজর কাড়ছে।

গ্রিনল্যান্ড এনার্জি তাদের প্রকল্প নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরির জন্য ফিল ম্যাকগ্র-কে নিয়োগ করেছে। ‘ডক্টর ফিল’ নামে পরিচিত এই প্রাক্তন টেলিভিশন সঞ্চালক মার্কিন দক্ষিণপন্থী মহলে পরিচিত মুখ। তিনি ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের সদস্য হিসাবেও কাজ করেছেন।

তথ্যচিত্রে তেল অনুসন্ধানকারীদের ‘আধুনিক যুগের ওয়াইল্ডক্যাটার’ হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংস্থার পরিচালকমণ্ডলীতেও রয়েছেন মার্কিন নৌবাহিনীর এক প্রাক্তন সদস্য। তিনি বর্তমানে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। ট্রাম্পের দাবি, আমেরিকার নিরাপত্তা এবং ওই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গ্রিনল্যান্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্থার চেয়ারম্যান ও অন্যতম বড় অংশীদার ল্যারি সোয়েটসেরও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সোয়েটসের বক্তব্য, তাঁদের তেল প্রকল্পের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনার কোনও সম্পর্ক নেই।

অনুমতি? ছিল না!

বিতর্কের শুরুটা অবশ্য আরও আগে।

জুন মাসে জেমসন ল্যান্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে এক বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড এনার্জির এক প্রতিনিধি দাবি করেছিলেন, তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম সেখানে নামানোর অনুমতি তাঁদের রয়েছে। পরে দেখা যায়, সেই দাবি সঠিক ছিল না।

সোয়েটস পরে স্বীকার করেন, প্রকল্প নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহের কারণেই তাঁদের বক্তব্য এমন ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, যাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

কিন্তু তার পরের মাসেই স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে অন্য ছবি। একটি টাগবোট একটি বার্জকে টেনে উপকূলের দিকে নিয়ে আসে। সেখান থেকে নামানো হয় প্রায় এক ডজন কন্টেনার।

গ্রিনল্যান্ড সরকারের বক্তব্য, জেমসন ল্যান্ডে পরিকল্পিত তেল অনুসন্ধানের জন্যই ওই সরঞ্জাম আনা হয়েছিল। ডেনমার্কের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্যানওয়াচ’-এর কাছে সংশ্লিষ্ট জাহাজ সংস্থার প্রধানও নিশ্চিত করেন, মালপত্রগুলি গ্রিনল্যান্ড এনার্জির জন্যই পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

অক্টোবরে ড্রিল?

গ্রিনল্যান্ড এনার্জি সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিলেও শেয়ারহোল্ডারদের পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক ও নজরদারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ‘গঠনমূলক’ হয়েছে।

খনন শুরু করার জন্য যে কয়েকটি অনুমোদন এখনও বাকি রয়েছে, সেগুলিও পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী সংস্থাটি।

প্রথমে দু’টি কূপ খোঁড়ার পরিকল্পনা থাকলেও এখন প্রথম ধাপে একটি কূপ খোঁড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংস্থার এক প্রতিনিধির দাবি, প্রায় ৩০০টি কন্টেনার ভর্তি খনন সরঞ্জাম নিয়ে একটি জাহাজ ১২ সেপ্টেম্বর কানাডা থেকে রওনা দেওয়ার কথা। সব ঠিকঠাক থাকলে অক্টোবরে শুরু হতে পারে কূপ খোঁড়ার কাজ।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-বিষয়ক দূত এবং লুইজিয়ানার দক্ষিণপন্থী গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, আগামী বছরই গ্রিনল্যান্ড থেকে তেল উত্তোলন শুরু হয়ে যেতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের ‘উভয়সঙ্কট’

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মূলত স্থানীয় নির্বাচিত সরকারের হাতে। ফলে তেল প্রকল্পটি নিয়ে তাদের সামনে এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অনুমতি দিলে একদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আন্তর্জাতিক ভাবে সুরক্ষিত অঞ্চলে তেল অনুসন্ধান ২০২১ সালের নতুন লাইসেন্স বন্ধের নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।

অন্যদিকে, অনুমতি না দিলে ট্রাম্প সেটিকে গ্রিনল্যান্ডের উপর মার্কিন চাপ আরও বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তাই আপাতত অত্যন্ত মেপে পা ফেলছে গ্রিনল্যান্ড সরকার। অনুমতি ছাড়াই সরঞ্জাম নামানোর ঘটনায় কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সেগুলি এখনই সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সরকারের বক্তব্য, এই মুহূর্তে সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া ‘সমানুপাতিক পদক্ষেপ’ হবে না। খননের অনুমতির আবেদন এখনও বিবেচনাধীন।

ফলে বিষয়টি এখন আর শুধু একটি তেল অনুসন্ধান প্রকল্প নয়। জেমসন ল্যান্ডের মাটির নীচে সত্যিই বিপুল তেলের ভাণ্ডার রয়েছে কি না, তা এখনও অজানা। কিন্তু তার আগেই এই প্রকল্প গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার, পরিবেশনীতি এবং ট্রাম্পের আর্কটিক ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতের নতুন মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles