বাংলাস্ফিয়ার: বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবার স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যুকে তিনি ‘লিঞ্চিং’ বলতে রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, এটি কোনও উন্মত্ত জনতার আকস্মিক হামলা ছিল না; বরং পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিই এলাকায় হিংসা উসকে দিয়েছে।

শনিবার বারুইপুরে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবার এবং নিহত ১১ বছরের কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, ‘‘এটি জনতার হাতে নির্বিচার মারধরের ঘটনা নয়। ইন্দ্রজিতের পরিচয় জানার পরেই তাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। এই হামলার পিছনে যারা নির্বাচনে হেরেছে, তাদেরই প্ররোচনা রয়েছে।’’

ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে একাধিক আর্থিক ও সামাজিক সহায়তার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি নিহতের দাদার হাতে সিভিক ভলান্টিয়ার পদে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। নিহতের বাবার জন্য বার্ধক্যভাতা এবং মায়ের জন্য অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধাও ঘোষণা করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকার এই পরিবারের পাশে রয়েছে এবং থাকবে। একজন যুবকের প্রাণ চলে গেছে, তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’’

অন্যদিকে, নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার মামলায়ও দ্রুত বিচার এবং কঠোরতম শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, নিহত কিশোরীর পরিবার তদন্তের শুরু থেকেই প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং চারজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি জানান, অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ছেড়ে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট সীমান্ত এলাকায় পালিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন তাদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তের অগ্রগতি তিনি নিজে পর্যবেক্ষণ করবেন বলেও জানান।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু যারা এই অপরাধ করেছে, তারা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে। দুই ক্ষেত্রেই হেফাজতে রেখে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’’

বারুইপুরের সূর্যপুরে একটি নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধনও করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই মঞ্চ থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কড়া বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেই প্রতিবাদের আড়ালে ভাঙচুর, পুলিশ আক্রান্ত করা বা জনসম্পত্তি ধ্বংস কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, ‘‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু যারা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে, পুলিশকে আক্রমণ করে, রেললাইনের উপর লোহার বিম ফেলে ট্রেন চলাচল ব্যাহত করার চেষ্টা করে, তারা দেশপ্রেমিক হতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

বারুইপুরে সাম্প্রতিক অশান্তির পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও আশ্বস্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আতঙ্ক কাটিয়ে দোকানপাট খুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে। সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই; ভয় পাওয়ার কথা অপরাধীদের।

তাঁর কথায়, ‘‘খুনি ও ধর্ষকরাই ভয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে ব্যবসা করুন, দোকান খুলুন, স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন।’’

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানেরও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী দু’সপ্তাহ ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গাঁজা, চরস এবং বেআইনি মদের আড্ডার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের মতে, অপরাধচক্রের সঙ্গে মাদক ব্যবসার যোগ খতিয়ে দেখতেই এই অভিযান।

বারুইপুরের ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা ইতিমধ্যেই তীব্র হয়েছে। বিরোধীরা যেখানে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির অভিযোগ তুলছে, সেখানে রাজ্য সরকার পাল্টা দাবি করছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী হিংসার নেপথ্যেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উস্কানি কাজ করেছে।

এখন নজর তদন্ত, চার্জশিট এবং আদালতের বিচারের দিকে। নাবালিকার ধর্ষণ ও হত্যা এবং ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যুর—দুটি ঘটনাতেই দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি বারুইপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন এবং মাদকবিরোধী অভিযান—এই তিনটি পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের বার্তাও স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।