স্বাস্থ্য

ডিএনএ-র নিয়মে নতুন ধাক্কা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • প্রোটিনই ঠিক করে দিচ্ছে ডিএনএ-র কোন উপাদান কোথায় বসবে—আণবিক জীববিজ্ঞানে এমন দৃশ্য এত দিন প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
  • এবার এমনই এক অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রোটিনের সন্ধান মিলেছে।
  • কোনও নিউক্লিক অ্যাসিডের ছাঁচ ছাড়াই সেটি নির্দিষ্ট ক্রমে ডিএনএ তৈরি করতে পারে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রোটিনই ঠিক করে দিচ্ছে ডিএনএ-র কোন উপাদান কোথায় বসবে—আণবিক জীববিজ্ঞানে এমন দৃশ্য এত দিন প্রায় অকল্পনীয় ছিল। এবার এমনই এক অদ্ভুত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রোটিনের সন্ধান মিলেছে। কোনও নিউক্লিক অ্যাসিডের ছাঁচ ছাড়াই সেটি নির্দিষ্ট ক্রমে ডিএনএ তৈরি করতে পারে। আবিষ্কারটি তাই আণবিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিমূলক ধারণা, ফ্রান্সিস ক্রিকের ‘কেন্দ্রীয় মতবাদ’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার এখনও কেন্দ্রীয় মতবাদকে ‘ভেঙে’ দেয়নি। বরং তার সীমারেখা কোথায়, সেই প্রশ্নটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

শুরুটা হয়েছিল অন্য প্রশ্ন দিয়ে

আণবিক জীববিজ্ঞানের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীদের সামনে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—জীবের বংশগতির তথ্য আসলে কোন অণু বহন করে?

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় প্রধান দুই দাবিদার ছিল নিউক্লিক অ্যাসিড—ডিএনএ ও আরএনএ—এবং প্রোটিন। সে সময় প্রোটিনকেই বেশি সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল। কারণ, প্রোটিন তৈরি হয় ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। বিপরীতে, নিউক্লিক অ্যাসিডে ব্যবহৃত নিউক্লিওটাইড মাত্র চার ধরনের। তাই এত কম উপাদান দিয়ে বিপুল পরিমাণ বংশগত তথ্য কী ভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় ছিল।

১৯৪৪ সালে অসওয়াল্ড অ্যাভেরি, কলিন ম্যাকলিয়ড এবং ম্যাকলিন ম্যাককার্টির গবেষণা সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দেয়। তাঁরা দেখান, রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন ও আরএনএ নষ্ট করলেও একটি উপাদান বেঁচে থাকে। সেই উপাদানটি রোগসৃষ্টিকারী নয় এমন ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে মেশালে তারাও রোগসৃষ্টিকারী হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু ডিএনএ নষ্ট করে দিলে সেই রূপান্তর আর ঘটত না।

১৯৫২ সালে আলফ্রেড হার্শি ও মার্থা চেজের বিখ্যাত পরীক্ষায় আরও পরিষ্কার হয় বিষয়টি। তাঁরা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করা ভাইরাস—ব্যাকটেরিওফাজ—ব্যবহার করে ফাজের ডিএনএ ও প্রোটিনকে আলাদা ভাবে তেজস্ক্রিয় চিহ্ন দিয়ে অনুসরণ করেন। দেখা যায়, সংক্রমিত ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে ঢুকছে ডিএনএ, প্রোটিন নয়। পরবর্তী প্রজন্মের ফাজেও সেই ডিএনএর চিহ্ন পাওয়া যায়।

বার্তা পরিষ্কার ছিল—বংশগতির মূল বাহক ডিএনএ।

এর পর জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ-র ‘ডাবল হেলিক্স’ বা দ্বিসূত্রক গঠনের মডেল সামনে আনেন। সেই গঠন থেকেই বোঝা যায়, কী ভাবে একটি ডিএনএ সূত্রকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে তার অনুরূপ আর একটি সূত্র তৈরি হতে পারে।

কিন্তু তাতেই প্রশ্ন শেষ হয়নি। বরং শুরু হল আরও বড় প্রশ্ন—ডিএনএ-তে জমা থাকা তথ্য ব্যবহার করে কোষ প্রোটিন তৈরি করে কী ভাবে?

ক্রিকের ‘কেন্দ্রীয় মতবাদ’

১৯৫৮ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে আণবিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রস্তাব করেন—‘সেন্ট্রাল ডগমা’ বা কেন্দ্রীয় মতবাদ।

সহজ করে বললে, তথ্য নিউক্লিক অ্যাসিড থেকে নিউক্লিক অ্যাসিডে যেতে পারে, নিউক্লিক অ্যাসিড থেকে প্রোটিনেও যেতে পারে। কিন্তু প্রোটিন থেকে সেই তথ্য আবার নিউক্লিক অ্যাসিডে ফিরে যেতে পারে না। প্রোটিন থেকে প্রোটিনে তথ্যের প্রবাহও সম্ভব নয়।

পরবর্তী গবেষণায় এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হল ডিএনএ → আরএনএ → প্রোটিন-এর পরিচিত পথ। ডিএনএ-র তথ্যের একটি আরএনএ অনুলিপি তৈরি হয়। সেই আরএনএ, বিশেষ করে এমআরএনএ, প্রোটিন তৈরির নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।

তবে বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ততই এই ছবিতে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে।

১৯৭০ সালে হাওয়ার্ড টেমিন ও ডেভিড বাল্টিমোর রেট্রোভাইরাসের ক্ষেত্রে ‘রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ’ নামে একটি উৎসেচকের ভূমিকা দেখান। এই উৎসেচক আরএনএকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে ডিএনএ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ তথ্যের প্রবাহ এক অর্থে উল্টো দিকে যায়—আরএনএ থেকে ডিএনএ।

প্রথমে মনে হয়েছিল, বুঝি ক্রিকের মতবাদে ফাটল ধরল। কিন্তু ক্রিক নিজেই পরে ব্যাখ্যা করেন, তাঁর মূল বক্তব্যে নিউক্লিক অ্যাসিডগুলির মধ্যে তথ্য স্থানান্তরের সম্ভাবনা তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর আপত্তি ছিল প্রোটিন থেকে নিউক্লিক অ্যাসিডে তথ্য যাওয়ার ক্ষেত্রে।

সেই সীমারেখাই এত দিন মোটামুটি অটুট ছিল।

এবার এল ডিআরটি৩

‘সেল’ এবং ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত দু’টি নতুন গবেষণাপত্রে ব্যাকটেরিয়ার রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজের একটি নতুন পরিবারের সন্ধানের কথা জানানো হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিফেন্স-অ্যাসোসিয়েটেড রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ ৩’ বা ডিআরটি৩।

এই উৎসেচকগুলির কাজ আরও অদ্ভুত।

সাধারণ রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ কোনও আরএনএ অণুকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে তার ডিএনএ অনুলিপি তৈরি করে। কিন্তু ডিআরটি৩ পরিবারের একটি উৎসেচক ডিআরটি৩বি কোনও ছাঁচ ছাড়াই ডিএনএ তৈরি করতে পারে। শুধু তাই নয়, ডিএনএর নিউক্লিওটাইডগুলি কোন ক্রমে বসবে, সেটিও সে নিজেই নির্ধারণ করে।

অর্থাৎ, বাইরে থেকে কোনও নিউক্লিক অ্যাসিডের ছাঁচ না নিয়েই প্রোটিনটি একটি নির্দিষ্ট ডিএনএ বিন্যাস তৈরি করছে।

এই ডিআরটি৩ ব্যবস্থা আসলে ব্যাকটেরিয়ার আত্মরক্ষার একটি কৌশল। ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে, তখন এই ব্যবস্থা এমন ডিএনএ তৈরি করতে সাহায্য করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়ার কোষকে সুপ্ত অবস্থায় নিয়ে যায়। ফলে ফাজ নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।

ডিআরটি৩ ব্যবস্থায় রয়েছে দু’টি উৎসেচক—ডিআরটি৩এ এবং ডিআরটি৩বি। তারা একসঙ্গে ডিএনএর দু’টি সূত্র তৈরিতে সাহায্য করে।

প্রথমটি খুব অস্বাভাবিক নয়। ডিআরটি৩এ একটি আরএনএ অণুকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে ডিএনএর প্রথম সূত্র তৈরি করে। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে আসে চমক। ডিআরটি৩বি কোনও ছাঁচ ছাড়াই দ্বিতীয় ডিএনএ সূত্র তৈরি করে।

আর সেই ডিএনএ-র ক্রম এলোমেলোও নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ডিআরটি৩বি সাইটোসিন ও অ্যাডেনিন—অর্থাৎ C এবং A—একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজিয়ে দিতে পারে। ফলে তৈরি হয় এমন একটি সরল পুনরাবৃত্তি—CACACACA…

ছাঁচ ছাড়াই ‘নকশা’!

ছাঁচ ছাড়া ডিএনএ তৈরি অবশ্য একেবারে নতুন ঘটনা নয়। ‘টার্মিনাল ডিঅক্সিনিউক্লিওটিডিল ট্রান্সফারেজ’ নামে একটি পরিচিত উৎসেচকও ছাঁচ ছাড়াই ডিএনএর প্রান্তে নিউক্লিওটাইড জুড়তে পারে।

কিন্তু সেখানে কোনও নির্দিষ্ট নকশা থাকে না। চার ধরনের নিউক্লিওটাইড উপস্থিত থাকলে প্রতিবার ভিন্ন ক্রম তৈরি হতে পারে।

ডিআরটি৩বি-র ক্ষেত্রে পার্থক্যটা এখানেই। এটি ছাঁচ ছাড়াই ডিএনএ তৈরি করে, কিন্তু তার তৈরি ক্রম নির্দিষ্ট। অর্থাৎ, কোন নিউক্লিওটাইডের পর কোনটি আসবে, সেই বিন্যাস প্রোটিনের কার্যকলাপ থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে।

এখানেই আবিষ্কারটির সবচেয়ে বড় কৌতূহল।

কারণ, এত দিন আণবিক জীববিজ্ঞানে তথ্যের ‘নকশা’ হিসেবে নিউক্লিক অ্যাসিডকেই দেখা হয়েছে। এবার দেখা যাচ্ছে, অন্তত একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি প্রোটিন নিজেই একটি নির্দিষ্ট নিউক্লিক অ্যাসিডের বিন্যাস তৈরি করতে পারে।

তবে কি কেন্দ্রীয় মতবাদ ভেঙে গেল?

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার।

দুটি গবেষণাপত্রকে ঘিরে কেউ কেউ বলেছেন, এই আবিষ্কার ক্রিকের কেন্দ্রীয় মতবাদকে চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, একটি প্রোটিনই নিউক্লিক অ্যাসিডের বিন্যাস নির্ধারণ করছে—অর্থাৎ তথ্য যেন প্রোটিন থেকে ডিএনএ-তে যাচ্ছে।

কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।

কেন্দ্রীয় মতবাদের মূল বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল—প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম থেকে সেই প্রোটিন তৈরির আদি ডিএনএ বিন্যাস পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। কারণ, একই অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম তৈরি করতে একাধিক ভিন্ন ডিএনএ বিন্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রোটিনে পৌঁছনোর সময় সেই অতিরিক্ত তথ্যের অনেকটাই হারিয়ে যায়।

ডিআরটি৩বি এই তথ্য-ক্ষয়ের নিয়মকে উল্টে দিচ্ছে না। এটি কোনও নির্দিষ্ট প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম ‘পড়ে’ তার আদি ডিএনএ কোড পুনর্গঠনও করছে না। বরং নিজের আণবিক কার্যকলাপের মাধ্যমে একটি সীমিত ও নির্দিষ্ট ডিএনএ বিন্যাস তৈরি করছে।

তাই একে কেন্দ্রীয় মতবাদের পতন বলা এখনও অনেক দূরের কথা।

বরং এই আবিষ্কার দেখাচ্ছে, জীববিজ্ঞানের নিয়মগুলি আমাদের ধারণার চেয়ে আরও সূক্ষ্ম। প্রকৃতি সব সময় পাঠ্যবইয়ের সরল তীরচিহ্ন মেনে চলে না। ডিএনএ, আরএনএ ও প্রোটিনের মধ্যে তথ্যের সম্পর্ক নিয়ে যতই জানা যাচ্ছে, সেই ছবিও ততই জটিল হচ্ছে।

ডিআরটি৩বি হয়তো সেই ছবির সীমারেখায় নতুন একটি দাগ টেনে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় মতবাদ এখনও দাঁড়িয়ে আছে—কিন্তু তার চারপাশের জগতটা যে আরও রহস্যময়, এই আবিষ্কার সেটাই মনে করিয়ে দিল।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles